আমরা     সংবাদ

সিনেমার মতো কাহিনি তবে বাস্তব

মুসলিমা জাহান | ২১ মার্চ ২০১৭, ০০:০৩  

সামাজিক বাধা মোকাবিলা করে যৌনপল্লিতে থেকেও তিনি সংসার পেতেছেন, মা হয়েছেন। এমনকি তাঁর বড় সন্তান এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। সে জন্য এখনো সংগ্রাম করতে হচ্ছে এই নারীকে। চোখ মুছতে মুছতে রাশেদা শোনান তাঁর যৌনকর্মী হয়ে ওঠার কথা।

রাশেদা বেগমের সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে পরিচয় সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্কের একটি অনুষ্ঠানে। তারপর দীর্ঘক্ষণ কথা হয় তাঁর সঙ্গে। অভাবের সংসারে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় সৎমা ছোটবেলাতেই বিয়ে দেন তাঁর। রাশেদা বলেন, ‘যখন বিয়ে হইছে তখন হাফপ্যান্ট পইরে ঘুইরে বেড়াই।’ বিয়ের কয়েক বছর যেতেই স্বামী আবার বিয়ে করেন। সঙ্গে চলে নির্যাতন।

নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে ফিরে আসেন বাবার বাড়ি। এখানে আবার শুরু হয় সৎমায়ের অত্যাচার। বাবাও ভালো ব্যবহার করতেন না। একদিন রাগ করে খুলনা চলে যান রাশেদা। সেখানে পূর্বপরিচিত একজনের কাছে আশ্রয় নিয়ে কাজ শুরু করেন একটি টেইলার্সে। কাজ শেষে ফেরার সময় এক রাতে ধর্ষণের শিকার হন রাশেদা। এ সময় তাঁকে মারধরও করা হয়। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করেন দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে। তখন রাশেদার বয়স ১৭ বছর। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। সারা দিন কান্নাকাটি করতেন।

সেখানে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একজন বলেন এসব বাদ দিয়ে নিজেকে খদ্দেরের জন্য তৈরি করতে। ‘লেখাপড়ার বেরেন ছিল না, বুদ্দিও ছিল না। এ জীবন থেকে বেরোনের কোনো পথই খুঁজি পাচ্ছিলাম না।’

এখানে প্রায়ই আসতেন চাকরিজীবী এক যুবক। প্রেম হয় রাশেদার সঙ্গে। ‘আমরা একজন আরেকজনরে ভালোবাসতাম। ওনার মাদ্যমে একদিন পলায়ে যাই। কিন্তু উনি আমারে বিয়ে করতি রাজি হননি। বাসা ভাড়া কইরে থাকার ব্যবস্থা করে দিছিলেন।’

রাশেদা বলেন, ‘তখন আমার বয়স ২১। দেখতি ভালো ছিলাম। আশপাশের বাড়িওয়ালা ডিসটাব করত। আবার, সেও আসে না। শেষমেশ আমি আবার দৌলতদিয়া চইলে আসতি বাধ্য হই।’

এটুকু বলে থামেন রাশেদা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন। শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেন। বলেন, ‘একবার এই জীবনে জড়ায়ে গেলি আর বেরোনো যায় না, বারে বারে একই জাগাই ঘুরতি হয়।’

ওই ঘটনার বছর দুই পরে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখেন রাশেদা। নতুন করে প্রেমে পড়েন আরেকজনের। তিনিও আসতেন এই যৌনপল্লিতে। ঘর বাঁধেন তাঁর সঙ্গে। সন্তান গর্ভে আসার পর স্বামীর আচরণ বদলে যায়, মারধর শুরু হয়। ১৭ দিনের বাচ্চাসহ তাড়িয়ে দেন। রাশেদা বলেন, ‘চিহারা-ব্যবহারে পাগল হয়ে ভালোবাসা সহজ, ঘর করা মেলা কঠিন।’

বাচ্চা কোলে নিয়ে এবার ঠাঁই নেন যশোর মাড়ুয়া মন্দির যৌনপল্লিতে। বছরের পর বছর এ জীবন যাপন করলেও অভ্যস্ত হতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে মানুষ আমাগের খারাপ ভাবে, কিন্তু আমাগের কষ্টের কতা কেউ ভাবে না।’

কিছুতেই মেয়েকে এ জীবনে দেখতে চান না রাশেদা। একসময় তিনি আশার আলো দেখেন। যশোরের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। তিনি রাশেদাকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু মানুষের কাছে তাঁর আসল পরিচয় প্রকাশ করতে পারবেন না বলে জানান। রাশেদা রাজি হন। রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয় তাঁদের।

এই ঘরে দুটি মেয়ের জন্ম হয়। আর আগের মেয়েটিও দিব্যি এই সংসারে বড় হতে থাকে। মেয়েটি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। বাকি দুই মেয়ের একজন এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে এবং আরেকজন নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। একটি জেলা শহরে ভাড়া বাসায় বাপ-বেটিরা মিলে থাকে। আর রাশেদা থাকেন যৌনপল্লিতে।

সন্তানদের ছেড়ে দূরে থাকতে কষ্ট হলেও তাঁদের মঙ্গলের কথা ভেবেই তিনি এখানে থাকেন। কারণ স্থানীয় অনেক পুরুষই তাঁকে চেনে, তাঁর খদ্দের। ছোট দুই মেয়ে জানে, মা চাকরি করায় তাঁদের সঙ্গে থাকেন না। তবে স্বামী প্রায়ই পল্লিতে আসেন।

বড় মেয়ে সব জানেন। মেয়ে বলেছেন, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিয়ে মাকে এ বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেবেন। ঢাকায় নিয়ে আসবেন; তবে মানুষ আর তাঁকে চিনতে পারবে না।

রাশেদা দিন গোনেন, কবে মেয়ে চাকরি নেবেন—কবে মিলবে তাঁর মুক্তি। স্বামীর প্রতিও তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রাশেদা বলেন, ‘এখনো দুনিয়ায় কিছু ভালো মানুষ আছে বইলেই বেঁচে আছি।’ 

পাঠকের মন্তব্য (২)

  • Sakibur Rahman

    Sakibur Rahman

    best of luck
     
  • Md. Kamal Hossain

    Md. Kamal Hossain

    What a different reality of once life !
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন