আমরা     সংবাদ

ফেসবুক থেকে হাসপাতাল

মানুষের পাশে মামুন

মানসুরা হোসাইন | ১১ মার্চ ২০১৭, ০২:০৬  

মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা আর হিসাবের হালনাগাদ নিয়মিত জানানো হয় ফেসবুকে, মামুনের উদ্যোগে শিশু ফেরদৌস চিকিৎসা ও পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেইনবক্সে সাহায্য–সহায়তার বার্তা আসে। সেগুলো পড়ে খোঁজ নেওয়া হয়। নিশ্চিত হওয়ার পর মামুন বিশ্বাস নিজের ফেসবুকে ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য সাহায্যের আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দেন। প্রতিদিনই সহায়তা আর হিসাবের হালনাগাদ জানিয়ে দেন ফেসবুকেই। পরে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সহায়তাপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয় অর্থ বা সামগ্রী। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন সিরাজগঞ্জের ২৯ বছর বয়সী মামুন বিশ্বাস। তাঁর কাজ নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।

সাত বছর বয়সী ফাতেমার পেটে বিশাল আকৃতির টিউমার। পানি জমে বেঢপ। এই শিশুর নাওয়াখাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হলো। বের করা হলো টিউমার ও জমে থাকা পানি। এখন মেয়েটি প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। অস্ত্রোপচারে খরচ হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

মামুন বিশ্বাস। ছবি: সংগৃহীতফাতেমার বাবা ভ্যানচালক ফজর আলী টেলিফোনে বলেন, ‘মামুন ভাই ফেসবুকের মাধ্যমে টাকা জোগাড় করে দিছেন। মেয়ে এখন ভালো আছে।’
এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন শাহাদত। তাঁর চোখসহ সারা শরীরে অসংখ্য মাংসপিণ্ড। তাঁর চিকিৎসার জন্য পাওয়া গেছে এক লাখ টাকা। জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা শাহাদতের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দিকা টেলিফোনে বলেন, মামুন নিজেই শাহাদতকে খুঁজে বের করেছেন। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর এক লাখের বেশি টাকা সহায়তা এসেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিকিৎসার বিষয়টি দেখা হচ্ছে। এখন শাহাদতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। এই শাহাদতের সঙ্গে ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াচ্ছেন মামুন।
এই মামুনের পোশাকি নাম মামুন বিশ্বাস। সিরাজগঞ্জের ২৯ বছর বয়সী এই যুবক মানুষকে সহায়তা করতে বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের দেয়াল। মামুনের নেওয়া উদ্যোগে ১ বছর ২ মাসের মাথায় এ পর্যন্ত ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে সহায়তা পেয়েছে ৩৭ জন। তাদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া চারজনকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য সহায়তা পাওয়া গেছে ১৫ লাখ ৬০ হাজার ৯৫৫ টাকা। ১৩টি হুইলচেয়ার, এক প্রতিবন্ধী মেয়ের নামে ১০ শতাংশ জমি বরাদ্দ পেতেও সহায়তা করেছেন মামুন।
ফেসবুকে মামুন বিশ্বাসের প্রোফাইলে সবকিছুই লেখা আছে। পেটে টিউমার নিয়ে ফাতেমার ছবির পাশে অস্ত্রোপচারের পর তার হাসিমুখের ছবি দেওয়া হয়েছে। সহায়তাপ্রাপ্ত অন্যদের বেলাতেও তাই। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের উপস্থিতিতে যে ব্যক্তির জন্য যখন যে সহায়তা পাওয়া যায়, তার হাতে টাকা তুলে দেওয়া হয়, যাতে কারও মনে কোনো সংশয় না থাকে। তবে তারপরও কেউ কেউ সন্দেহ যে করেন না, তা নয়। কিন্তু থেমে গেলে তো চলবে না।
সবার মুখে হাসি, পাখির জন্য বাসা তৈরির মতো কাজও করেন এই তরুণ,  মামুনের সংগৃহীত অর্থ দুস্থ রোগীর হাতে তুলে দিচ্ছেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসকফেসবুকে সহায়তার আহ্বান জানানোর পর ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা জমতে জমতে তা লাখ ছাড়িয়ে যায়। টাকা সংগ্রহের একটি পর্যায়ে হয়তো জানা যায় আর টাকার প্রয়োজন নেই। মামুন বিশ্বাস বললেন, ‘তখনই তা ফেসবুকে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে এই লোকের আর টাকার প্রয়োজন নেই। আবার চিকিৎসা বা সহায়তায় কিছু টাকা বেঁচে গেলেও তা অন্য কোনো ব্যক্তির সহায়তায় দেওয়া হয় না। কেননা যিনি টাকাটা দিয়েছেন, তিনি তো সুনির্দিষ্টভাবে ওই ব্যক্তির জন্যই দিয়েছিলেন, তাই তাঁর বা তাঁর পরিবারের হাতেই বাকি টাকা তুলে দেওয়া হয়।’ প্রতিদিনের হিসাব ফেসবুকেই জানিয়ে দেন মামুন।
৫ মার্চ রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বসেই কথা হলো মামুনের সঙ্গে। নিজের মুঠোফোনে দেখালেন তাঁকে নিয়ে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে করা একটি প্রতিবেদন। মুখে তাঁর হাসি লেগেই আছে। জানালেন, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, ক্যানসার রোগী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহায়তা চাওয়া হয়। কারও টাকার অভাবে বিয়ে হচ্ছে না, কারও একটি হুইলচেয়ার বা একটি রিকশা, ঘর বা দোকান করে দিলেই হয়, সেই সব ব্যক্তিরও পাশে দাঁড়ান তিনি।
প্রথম আলো কার্যালয়ে মামুন বিশ্বাস। ছবি: জাহিদুল করিমফেসবুকের মাধ্যমে কাজটা কীভাবে হয়? মামুন বলেন, ‘মানুষ তেমন একটা সহায়তা করতে চাইত না। আসলে প্রচুর ভালো মানুষ আছেন, কিন্তু মানুষ আস্থা পায় না বলেই সহায়তা করতে চান না।’ ফেসবুকের ইনবক্সে যে ব্যক্তির সহায়তা প্রয়োজন, সেই ব্যক্তি নিজে বা অন্যরা মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারপর মামুন নিজে যান বা অন্য এলাকার হলে ফেসবুকের বন্ধুদের ঘটনা সত্য কি না, তা জানার জন্য পাঠান। সব তথ্য সত্য মনে হলে তখন মামুন ছবিসহ ফেসবুকে সহায়তা চেয়ে পোস্ট দেন। তারপর আর খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। নিজের এক বোন প্রতিবন্ধী হওয়ায় সহায়তাপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যাটাও একটু বেশিই থাকে।
মামুন পড়াশোনা করেছেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। স্ত্রী আছিয়া বেগম ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে, বাবা-মা ও ভাই-বোন নিয়েই মামুনের সংসার। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের আগুনকালি গ্রামে তাঁর বসবাস। মামুন মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ঢাকা থেকে কিনে নিয়ে এলাকায় বিক্রি করেন।
ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতেও উঠে আসে মামুনের গল্পনিজের বেদনাবিধুর এক ঘটনা এ কাজ শুরু করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে মামুন বিশ্বাসকে। জন্মের ৩৮ ঘণ্টার মাথায় মামুনের ছেলে মারা যায়। এর মধ্যে তাঁকে দৌড়াতে হয় চারটি হাসপাতালে। মামুন বলেন, ‘সেই অর্থে আমার টাকার অভাব ছিল না। কিন্তু আমার ছেলেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আর যাদের টাকা নেই তাদের তো আরও কষ্ট। অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার কথা তখনই মাথায় আসে।’
শুধু মানুষ নয়, পশুপাখির জন্যও মন কাঁদে মামুনের। ২০১৩ সাল থেকে নিজের গ্রামে পাখির অভয়াশ্রম গড়ে তোলার কাজে
লেগে আছেন। এখন বেশ গর্ব করেই বলেন, ‘আমার গ্রাম পাখিশিকারি মুক্ত।’
পাখি নিয়ে একটি টিভি অনুষ্ঠানে অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঙ্গে মামুনমামুনের কিছু কষ্টও আছে। সিরাজগঞ্জের সাত মাস বয়সী হিমুর হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র ছিল। ২ লাখ ৩৫ হাজার ৮৩৫ টাকা সহায়তা পাওয়া যায়। ঢাকার মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় হিমু। হিমুর চিকিৎসায় খরচ হয় ৮৫ হাজার টাকা। বাকি দেড় লাখ টাকা হিমুর মায়ের নামে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে দেওয়া হয়েছে।
এভাবেই মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন মামুন বিশ্বাস। আর এ কাজে বেছে নিয়েছেন ফেসবুকের মতো শক্তিশালী এক মাধ্যম।

 

পাঠকের মন্তব্য (২)

  • abul fajol

    abul fajol

    মামুন অনেক বড় মাপের মানুষ,আমাদের আসল hero।মামুনের জন্য দোয়া রইলো।প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।
     
  • mahfuza bulbul

    mahfuza bulbul

    মামুন, তুমিই প্রকৃত মানুষ।
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন