আমরা     সংবাদ

দিনাজপুরে মেয়েদের হকি দল

স্টিক–বলে স্বপ্ন দেখা

মোহাম্মদ আলী খন্দকার | ১১ মার্চ ২০১৭, ০১:৪৯  

দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল। জেলা শহরে এই বিদ্যালয় ‘বাংলা স্কুল’ নামেই বেশি পরিচিত। প্রতিদিন ছুটির পর বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, বেঞ্চে, বারান্দায় যখন নীরবতা নামতে শুরু করে, তখনই জার্সি পরা একদল কিশোরীর দেখা মেলে মাঠে। তারা নীরবতা ভেঙে স্টিক-বলে সরব করে তোলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। এই মেয়েরা হকি খেলে। বিদ্যালয়ের হকি দলের সদস্য।
বাবা-মায়ের টানাপোড়েনের সংসার। কয়েক মাইল পথ মাড়িয়ে স্কুলে আসা। খেয়ে না-খেয়ে দিন পার করা। তবু যেন খেলাই তাদের ধ্যানজ্ঞান। রোজকার কষ্ট ভুলে তারা ডুবে যায় প্রশিক্ষণে। এদের অনেকের হাত ধরেই বিদ্যালয়ের তাকে জমা হয়েছে হকির বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার।
৭ মার্চ বিদ্যালয়ে হকি দলের শুরুর গল্পই সামনে আনলেন বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক আকতারুল ইসলাম। এই শিক্ষকের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল মেয়েদের হকি দল। তিনি বলেন, ‘২০১১ সালের ঘটনা, কয়েকজন মেয়ে এসে আগ্রহ দেখাল হকি দল গঠনের। প্রধান শিক্ষক শুনে সঙ্গে সঙ্গেই অনুমতি দিয়েছিলেন।’ ১৬ জন শিক্ষার্থীর সে দল বছর গড়াতেই সুখবর আনল। ২০১২ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি তাদের হাতে। এরপর ঢাকা মহিলা হকি লিগে জাতীয় পর্যায়ে রানারআপ ট্রফি। মহিলা হকি লিগের খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকার মাওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে। রানারআপ ট্রফির সঙ্গে পাওয়া ১০ হাজার টাকাও পুরস্কার পায় তারা। প্রতীকী চেকটি এখনো শোভা পাচ্ছে স্কুলের শোকেসের ওপর।
কোচ আকতারুল ইসলামের সঙ্গে বিউটি ও বৃষ্টি২০১৩ সালেও আসে জয়। আগের বছরের মতো বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ও মহিলা হকি লিগে রানারআপ হয়। সেবার ট্রফির সঙ্গে ১০ হাজার টাকাসহ একটি ফ্রিজ উপহার পায় তারা। সেই বিজয়ী দলের ১০ জন সদস্য এখনো বিদ্যালয়ের হকি দলে আছে। তাদের কেউ নবম শ্রেণিতে, কেউবা দশম শ্রেণিতে পড়ে। দলে আছে আরও কয়েকজন মেয়ে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা শুরুর যাত্রা ধরে রাখতে পারেনি। তবে নিয়মিত চর্চা আর বিভাগীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ ছিল নিয়মিত। দশম শ্রেণির শাকিলা আক্তার বলে, ‘জার্সি পরলে প্রতিবেশী আর এলাকার মানুষ অন্য চোখে দেখে। কটু কথা বলে। এ জন্য অনেক সময় পরিবার থেকে বাধা আসে। খেলা বন্ধ করতে হয়। তবে আমরা সুযোগ পেলে অনেক ভালো করতে পারব।’
হকি দলের বৃষ্টি আক্তার ও বিউটি আক্তার। দুই বোন। বাড়ি শহর থেকে তিন মাইল দূরের মাতাসাগরে। বৃষ্টি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে আর বিউটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তাদের মা একটি বেসরকারি ক্লিনিকে আয়ার কাজ করেন। অর্থের অভাবে গত দুই বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকার পর এ বছর আবার বিউটি স্কুলে পা রেখেছে। প্রতিদিন তিন মাইল হেঁটে স্কুলে আসে। দুপুরের টিফিন খেয়েই বিকেলের প্রশিক্ষণ শুরু করে দুই বোন। বিউটি বলল, ‘খেলাধুলা করতে আমাদের অত্যন্ত ভালো লাগে। তাই দূর হলেও প্রতিদিন খেলতে আসি।’
সমাজের এই বাধা তারা অতিক্রম করে মনের জোরে। কিন্তু পরিবারের দারিদ্র্য তারা এড়াতে পারে না। তাই অনেকে ঝরে পড়ে দল থেকে। তবু অগ্রজ ও বিজয়ী সতীর্থদের অনুসরণ করে এই মেয়েরাও স্বপ্ন দেখছে আবার জাতীয় পর্যায়ে ভালো কিছু করার। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমসের আলী বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কিন্তু তারা সবাই প্রায় দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। অনেকে পড়তে পারছে না টাকার অভাবে। এর মধ্যেই তারা খেলাধুলার চর্চা করছে।’
দিনাজপুর জেলায় অনেক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলার দলও রয়েছে। তবে মেয়েদের হকি দলের ঘটনা বিরল। দিনাজপুরের ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির জ্যেষ্ঠ কোচ সৈয়দ সায়েম হোসেন বলেন, ‘দিনাজপুর জেলায় মেয়েদের হকি দল আছে মাত্র দুটি। যার একটি আবার গত মাসে গঠন করা হয়েছে। আশা করি এই মেয়েদের দেখে অন্য মেয়েরাও হকিতে আগ্রহী হবে।’

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন