আমরা     সংবাদ

সাদিয়ার ফোনে ক্লাসনোটের ছবিই ছিল বেশি

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১০:৫২  

২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে হড়গ্রামে সাদিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল তাঁর মা শুয়ে আছেন বিছানায়। কথা বলার মতো অবস্থা নেই। সাদিয়ার বাবার সঙ্গে কথা হলো। তিনি বারবার মেয়ের ছোটবেলার স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছিলেন: ‘ছোটবেলা থেকেই মেয়ে পড়াশোনায় যেমন অসম্ভব ভালো ছিল, তেমনি নাচ-গানেও পারদর্শী হয়ে উঠেছিল। শিশুশিল্পী হিসেবে দুবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের যেকোনো অনুষ্ঠানেই সাদিয়ার ডাক পড়ত।’

মায়ের সঙ্গে সেলফিতে সাদিয়াসাদিয়া হাসান রাজশাহী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় (হেলেনাবাদ) থেকে এসএসসি ও নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। দুটোতেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বাড়ির আলমারি ভরে আছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাদিয়ার পাওয়া সনদপত্র আর মেডেলে।
সাদিয়া ভালো গান করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগেও ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবার চাইল মেডিকেল কলেজে পড়াতে। হাসানুজ্জামান বললেন, ‘ও চিকিৎসক হবে। এতে মেধার স্বীকৃতিটা বেশি পাওয়া যাবে। সে-ও চিকিৎসক হিসেবে সমাজে বেশি অবদান রাখতে পারবে। দুর্ভাগ্যবশত সরকারি মেডিকেল কলেজে তার ভর্তির সুযোগ হলো না। তাই বেসরকারি মেডিকেল কলেজেই ভর্তি করে দেওয়া হলো। সেখানেও সে ভালো ফলাফল করেছে।’

সাদিয়ার ওয়ার্ড ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর গাইনোকলজি পরীক্ষা ছিল। বাবা জানালেন, ‘ওর মা ফোনে সকালে ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন। বিকেলে আবার মাকে ফোন করত। মা-মেয়ে প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে কথা বলত। রাতে ঘুমানোর আগে আবার মায়ের সঙ্গে কথা বলত। এ ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন। বাড়ির প্রতি তার খুব টান ছিল। এক দিন ছুটি পেলেই রাজশাহী চলে আসত।’

২৩ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা দিয়েই রাজশাহীতে চলে এসেছিলেন সাদিয়া। আবার শনিবার সকালে পরীক্ষা ছিল। তাই শুক্রবার রাতেই তাঁকে যেতে হবে। রাত ১২টায় দেশ ট্রাভেলসের একটি বাসে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়। রাতের কারণে মা-ও সঙ্গে গেলেন।

বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সবাই ধরাধরি করে সাদিয়ার মাকে বসার ঘরে নিয়ে এলেন। কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলেন কিন্তু কিছুতেই কান্না চাপতে পারছেন না। একটু স্থিত হয়ে বললেন, ‘আমি ছিটকে পড়ে গেছি। উঠে দেখি মেয়ে সিএনজির ভেতরে আটকে রয়েছে। আমি তাকে বের করতে পারছি না। কিছুক্ষণ পরে পথচারীরা এসে টেনে বের করলেন। আমি আম্মু আম্মু বলে ডাকছি। আমার আম্মু আর কথা বলে না। তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। একজন পথচারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।’ কিন্তু জরুরি বিভাগে আগে টিকিট কাটতে হবে। শাহিন সুলতানা নিজেও আহত। একজন একটা টিকিট এনে দেন। সাদিয়ার মা বলতে থাকেন: ‘আমার বুকের মধ্যে ছটফট করে যাচ্ছে মেয়েটাকে সঙ্গে সঙ্গে আমি আইসিইউতে নিতে পারলাম না। ওর ফুফাতো বোন ফারিয়া মাহাবুবাও চিকিৎসক। ঢাকায় থাকে। ওকে ফোন করি। ও এল। এরপর যখন আইসিইউতে নেওয়া হলো, তখন সব শেষ।’ ডুকরে কেঁদে উঠলেন শাহিন সুলতানা, ‘আমি পাশে থেকেও মেয়ের জন্য ভালো চেষ্টা করতে পারলাম না। মেয়ের এত জাতীয় পুরস্কার দিয়ে আমি আজ আর কী করব?’

একটা ছবি দেওয়ার জন্য বড় ভাই আবদুল্লাহ সাদিয়ার মুঠোফোনটি নিয়ে এলেন, তাতে মাত্র দু-একটি ছবি পাওয়া গেল। ফোনজুড়ে শুধুই নোটের ছবি। বললেন, ‘হাতের কাছে বই না থাকলেও ফোন খুলেই পড়ত। সময় নষ্ট হবে বলে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলেনি। বলেছিল, “ভাইয়া, পাস করে চিকিৎসক হয়ে তারপর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলব।”’

পাঠকের মন্তব্য (১০)

  • wu jia ming

    wu jia ming

    নতুন নতুন অঙ্গিকার নিয়ে সরকার আসে, নতুন যোগাযোগ মন্ত্রী হয় । এই করবে সেই করবে বলে কথার ফুলঝুরি ফোটায় , নিজেরা দামি দামি গাড়িতে চড়ে বেড়ায় । পথের ধুলা তাদের নাকে ঢুকে না , সাইরেন বাজিয়ে পুলিশ এর কড়া পাহারায় চলাফেরা করে । আর রাস্তায় জীবন দিতে হয় আমাদের সাধারণ মানুষদের । ঢাকা শহরে পরিবহণ সিন্ডিকেট এর কাছে মানুষ এখন বন্দি । কে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে সর্বশেষ কবে সি এন জি তে ভাড়ায় চড়েছে ? লক্কর ঝক্কর মার্কা গাড়িগুলো কোন আইন কানুনের তোয়াক্কা করে না ,রাস্তায় যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে সব সময় , মানুষ ফুটঅভার ব্রিজ থাকার পরও রাস্তার ডিভাইডার ডেঙ্গিয়ে যত্রতত্র রাস্তা পার হয় । যার কারণে প্রতিদিন দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে । আইন আছে , প্রয়োগ নেই । এভাবেই চলছে আমাদের দেশ ।
     
  • Hasan Chow

    Hasan Chow

    এভাবে আর কত জীবন অকালে হারিয়ে যাবে আমার জানা নেই। তবে যারা স্বজন হারিয়েছে, তা্রই জানে এ অকালে প্রাণ হারানো কখনও ভোলা যায় না। সাদিয়াকে জান্নাতবাসী করুন অাল্লাহ।
     
  • hidden

    Too tragic! Hard to control my tears.
     
  • Md. Shah Alam Khan (Shimon)

    Md. Shah Alam Khan (Shimon)

    আমরা আর কত সাদিয়াদের এভাবে অকালে হাড়াবো ????!!!! সাদিয়ারা জাতির সম্পদ, জাতীয় সম্পদ। একজন বাস চালকের আইনানুগভাবে সাস্তি হলে বেআইনি ভাবে পরিবহন ধর্মঘট ডেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দিনের পর দিন কষ্ট দেওয়া হয়। সরকারও পরিবহন শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে বলে মনে হয়। সরকার কঠোর হয়ে শুধু বিরোধী দল দমন করলে হবে না সকল অন্যায় কঠোর হাতে দমন করতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান এর ক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষা এবং গাড়ির ফিটনেস এর ব্যপারে সরকার যদি কঠোর হয় তাহলে আমার মনে হয় এমন অনাকাংখিত ঘটনা থেকে আমরা কিছুটা হলেও রক্ষা পাব।
     
  • আশরাফ

    আশরাফ

    এই চালক যাবজ্জীবন না পাক, ৫/১০ বছরের জেল তো পেতে পারে!
     
  • mahfooz

    mahfooz

    পরিবহন শ্রমিকরা শাস্তির আওতার বাহিরে। যত বড় দুর্ঘটনা বা মানুষ মারা যাক- তাদের কেন শাস্তি হবে ? পথচারীরই তো সমস্ত দোষ। কোন আইনের বাধনে কি তাদের রোখা সম্ভব?এই সব সম্ভবের দেশে ড্রাইভার শাস্তি না হওয়াটাই সম্ভব। এটাই এখন বাস্তবতা। এটাই মেনে নিয়ে ভাবতে হবে আমরা সাধারণ জনগণই সকল নিয়মের বলী।
     
  • mahfooz

    mahfooz

    পরিবহন শ্রমিকরা শাস্তির আওতার বাহিরে। যত বড় দুর্ঘটনা বা মানুষ মারা যাক- তাদের কেন শাস্তি হবে ? পথচারীরই তো সমস্ত দোষ। কোন আইনের বাধনে কি তাদের রোখা সম্ভব?এই সব সম্ভবের দেশে ড্রাইভারের শাস্তি না হওয়াটাই সম্ভব। এটাই এখন বাস্তবতা। এটাই মেনে নিয়ে ভাবতে হবে আমরা সাধারণ জনগণই সকল নিয়মের বলী ।
     
  • mahfooz

    mahfooz

    পরিবহন শ্রমিকরা শাস্তির আওতার বাহিরে। যত বড় দুর্ঘটনা বা মানুষ মারা যাক- তাদের কেন শাস্তি হবে ? পথচারীরই তো সমস্ত দোষ। কোন আইনের বাধনে কি তাদের রোখা সম্ভব?এই সব সম্ভবের দেশে ড্রাইভারের শাস্তি না হওয়াটাই সম্ভব। এটাই এখন বাস্তবতা। এটাই মেনে নিয়ে ভাবতে হবে আমরা সাধারণ জনগণই সকল নিয়মের বলী ।
     
  • hidden

    এভাবে প্রতিদিন বাংলাদেশের রাস্তায় এক একটি স্বপ্নের করুণ মৃত্যু হচ্ছে। আর আমরা সবাই নিস্পৃহ ভাবে মৃত্যুর মিছিল প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছি। একদিন হয়তো অবধারিতভাবে আমাদের পরিবারেরই আরো কোন স্বপ্ন বা স্বপ্নরা এই মিছিলে যুক্ত হবে। আল্লাহ সকলের হেদায়েত দিন, সকলকে রক্ষা করুণ।
     
  • Abdul Jabber

    Abdul Jabber

    চরম বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক।। জানিনা কবে এই মৃত্যুর মিছিল থামবে।। সড়ক পথে শৃংখলা ফিরিয়ে আনাই সময়ের সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।।
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন