ক্রিকেটের লাইভ স্কোর

    খেলা     সংবাদ

বলবয়ের ফুটবল একাডেমি

বদিউজ্জামান | ২১ মার্চ ২০১৭, ০১:৩৮  

নিজের একাডেমির ফুটবলারদের অনুশীলন করাচ্ছেন আবদুর রহমান। গতকাল পল্টন আউটার স্টেডিয়ামে l ছবি: হাসান রাজাজন্মগতভাবেই প্রতিবন্ধী তিনি। কথাবার্তা স্পষ্ট করে বলতে পারেন না। জন্মেছিলেন দুটি কাটা কান নিয়ে। দেখে মনে হয়, যেন আগুনে পুড়ে গেছে চোয়ালের এক পাশ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে ঢুকলেই জড়ানো উচ্চারণে স্বাগত জানাবেন, ‘সাড় (স্যার) চা খাইবেন?’ গণমাধ্যমকর্মীদের ফুটফরমাশ খেটেই যত আনন্দ আবদুর রহমানের। কখনো খেলোয়াড় তালিকা সরবরাহ করবেন। কখনো চা-নাশতা, পানির বোতল এগিয়ে দেবেন। বলবয়ের ভূমিকায়ও দেখা যায় কখনো-সখনো। রহমান কিন্তু বলবয়ও!
স্টেডিয়াম এলাকার চেনামুখ আবদুর রহমান। তবে এসবের বাইরেও ইদানীং আরেকটি পরিচয় যোগ হয়েছে তাঁর। নিজের নামে ফুটবল একাডেমি গড়েছেন রহমান। আগামী মৌসুমের পাইওনিয়ার লিগের জন্য নামও নিবন্ধন করেছে তাঁর ‘রহমান ফুটবল একাডেমি’। পল্টন আউটার স্টেডিয়ামে প্রতিদিন বিকেলে এই একাডেমির শখানেক কিশোর ফুটবলার অনুশীলন করছে। কেরানীগঞ্জ, ফকিরাপুল, সেগুনবাগিচা, মিরপুর এমনকি নারায়ণগঞ্জ থেকেও কিশোর ফুটবলাররা এসে অনুশীলন করে রহমানের একাডেমিতে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণজ্ঞান নেই রহমানের। ফুটবলের ব্যাকরণটাও ভালোমতো জানেন না। দেখে শেখা অভিজ্ঞতাটাই সম্বল। তা-ই কাজে লাগাচ্ছেন। আগ্রহের কমতি নেই কিশোর ফুটবলারদের শেখানোয়। বিনা খরচে অনুশীলনের পাশাপাশি সবাইকে জার্সিও কিনে দিচ্ছেন নিজের পয়সায়!
চট্টগ্রামের রাজাখালী গ্রামে আবদুর রহমানের বাড়ি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। ওই বছর ঘূর্ণিঝড়ে বাবাও মারা যান। এরপর ভাইয়ের সংসারে আর ঠাঁই হয়নি। গ্রাম থেকে ভাগ্য অন্বেষণে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। শহরের শুঁটকির বাজারে কিশোর বয়সেই কুলির কাজ করতেন। সেটা ২০০১ সালের কথা। কিন্তু সে কাজে মন বসেনি। বন্ধুর সঙ্গে একদিন চেপে বসেন ঢাকার ট্রেনে। কমলাপুরে নেমে এদিক-সেদিক কিছুদিন ঘুরেছিলেন। কমলাপুর, সদরঘাটে ‘কিছু একটা’ করার চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু কোনো কাজই পছন্দ হয়নি। ফুটবল ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা তাঁকে প্রেসবক্সে সহকারীর কাজটি জুটিয়ে দেন। এরপর থেকে স্টেডিয়ামই রহমানের ‘ঘরবাড়ি’। পল্টনের হ্যান্ডবল ফেডারেশনে ঘুমান। কিছুদিন আগে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনুর তাঁকে নৈশপ্রহরীর চাকরি দিয়েছেন।
এত কিছু থাকতে ফুটবল একাডেমি গড়ার শখ কেন? রহমানের মুখে হাসিমাখা উত্তর, ‘রাস্তাঘাটে দেখি ছেলেরা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নেশা করছে। আজেবাজে কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এসব দেখেই একদিন কয়েকজনকে বলি, ভাই তোরা আমার কাছে এসে ফুটবল খেলিস।’
আট বছর আগে একটু একটু করে একাডেমি গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন রহমান। প্রথমে নাম দিয়েছিলেন সেভেন স্টার ফুটবল একাডেমি। ফুটসাল ও ‘টোকাই’ ফুটবল টুর্নামেন্টে নিয়মিত খেলেছে এই একাডেমির ছেলেরা। গত বছর হবিগঞ্জে প্রীতি ফুটবলে হয়েছিল রানার্সআপ, কেরানীগঞ্জে মান্ডাইল ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন।
বিভিন্ন সময়ে পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া অল্প কিছু জমানো টাকা দিয়ে একাডেমিটা চালাচ্ছেন রহমান। আরামবাগের ফুটবলার বন্ধু সোহেল রানাও টুকটাক সহায়তা করেন। কিন্তু বল কেনার টাকাটাও মাঝেমধ্যে জোগাড় করতে পারেন না। ফুটবল ফেডারেশনে অবশ্য কিছু বল চেয়ে একটা লিখিত আবেদন দিয়েছেন। সাড়া মেলেনি। কোনো পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে একাডেমিটা পেত স্বপ্নের ঠিকানা। রহমানের কণ্ঠে সেই আকুতি, ‘এখন দলবদল চলছে পাইওনিয়ারের। আমাদের একাডেমির সাতজন খেলোয়াড়কে বিভিন্ন দলে নাম নিবন্ধন করিয়েছি। কিন্তু একজন ভালো কোচ রাখতে চাই। অনুশীলনের জন্য আরও খরচ আছে। যদি কেউ পৃষ্ঠপোষকতা করত, তাহলে একাডেমিটা আরও ভালোভাবে চলত।’
সারা দেশে এখন সেভাবে ফুটবলের জোয়ার নেই। সিলেটে স্থবির হয়ে আছে বাফুফের ফুটবল একাডেমি। তা সত্ত্বেও আবদুর রহমান সারা দিন ফুটবল মাঠে পড়ে থাকেন ফুটবলের এক সোনালি দিনের স্বপ্নে।

 

পাঠকের মন্তব্য (১)

  • Ranjan Saha

    Ranjan Saha

    I would like to help this academy. Can you ask him to send me an email in ranjankr.saha@yahoo.com
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন