রস+আলো     সংবাদ

চলতি রস

আমায় ডেকেছিলে রাত দুটোর নিমন্ত্রণে

আসিফ মেহ্দী | ২০ মার্চ ২০১৭, ০০:৩৩  

এ মুহূর্তে কবিগুরুর লেখা চরণটি বড় মনে পড়ছে, ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’। এবার অবশ্য ছুটিতে আমার ডাক পড়েনি; ডাক পড়েছে রাত দুটিতে! মা-বাবা শখ করে আমার নাম রেখেছেন ‘নিরাপত্তাহীনতা’। সেই নামকরণের সার্থকতা প্রমাণের জন্য তোমাদের নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় প্রহর গুনি। গেল সপ্তাহে রাত সোয়া দুইটায় মালিবাগের উড়ালসড়কের নিমন্ত্রণে আমি তোমাদের ওপর হামলে পড়েছিলাম। কেমন ছিল সেই হামলে পড়া? তৈরি হয়েছে কি খবরের শিরোনাম? গঠিত হয়েছে কি তদন্ত কমিটি? সম্পন্ন হয়েছে কি বেলা বিস্কুট আর চায়ের কাপে টক শো? লিখিত হয়েছে কি রাত দুটোর কবিতা?
সেই রাতের দুর্ঘটনার জন্য উড়ালসেতুর পায়ে কুড়াল মারার কিছু নেই। তারও তো আছে পতনের অধিকার! অধঃপতনের অধিকার শুধু মানুষের একচেটিয়া হতে পারে না। তোমরা মানুষেরা উড়ালসেতুকে চিরকালই অবজ্ঞা-অবহেলা করেছ! লেখকেরা ছাইপাঁশ সাহিত্যে লেখে ‘সেতুবন্ধন’; শব্দটি ‘উড়ালসেতুবন্ধন’ হলে ক্ষতি কী ছিল? কৌশলী প্রকৌশলীদের বলতে শুনি ‘ব্রিজ রেকটিফায়ার’; অথচ নামকরণ ‘ফ্লাইওভার রেকটিফায়ার’ হলে কত না শ্রুতিমধুর হতো! মানুষের ষড়যন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে আটকে ‘উড়ালসেতু’ চিরকালই সুবিধাবঞ্চিত থেকেছে তার সৎভাই ‘সেতু’ বা ‘ব্রিজ’-এর কাছে। এই দুঃখে সে ভেঙে পড়লে সেটিও তার দোষ? ‘উড়ালসেতু’ যে অপমানে-অভিমানে উড়ে যায়নি, এটিই তো অনেক! ‘গার্ডার’ যে ঘরে ঘরে গিয়ে মার্ডার করে আসেনি, এই তো ঢের!
মানুষজাতির প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে রয়েছে ত্যাগের ইতিহাস। তোমরা এত বড় একটি ফ্লাইওভার অর্জন করতে যাচ্ছ, সে জন্য একটি-দুটি মানুষের জীবন বর্জন তো সামান্যই! আমি তো ভেবে পাই না, এত বড় স্ট্রাকচার নির্মাণের ‘সিস্টেম লস’ এত কম কীভাবে হয়! এর আগেও তো ‘নিরাপত্তাহীনতা’র এমন দৈন্যদশা ছিল না! চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে উড়ালসড়কের গার্ডার ভেঙে ১২ জন মারা গিয়েছিল; অথচ এবার এত বড় উড়ালসড়কের মৃত্যুর এ কী শীর্ণ-জীর্ণ পরিসংখ্যান!
মানুষের জীবনে যেমন উত্থান-পতন আছে, তেমনি উড়ালসড়কের জীবনেও উত্থানের সঙ্গে পতন থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। বলতে পারো, আমি নিজের অর্থাৎ ‘নিরাপত্তাহীনতা’র সাফাই গাইছি। আসলে অনিয়ম দেখলে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি, এটিই আমার নীতি। নীতি অমান্য করার সাধ বা ইচ্ছা আমার নেই। নীতি-নিয়ম মানো না শুধু তোমরা; যারা ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব’ বলে নিজেদের দাবি করো! প্রাণঘাতী প্রতিটি ইস্যু হওয়া উচিত শিশুর মতো মূল্যবান; অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সেগুলোর প্রতিকারে ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অথচ তোমরা তাকে হিসুর সমতুল্যও মূল্য দাও না! নতুন ইস্যু আসে, পুরোনো ইস্যু হারিয়ে যায়। এমন চলতে থাকলে আমি বারবার আসব; নিমন্ত্রণ পাই বা না পাই। তোমাদের অনিয়ম দেখে মাঝেমধ্যে মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বইয়ের মতো আমিও লিখে ফেলি একটি বই, ‘তোমাদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা’!

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন