পাঁচমিশালি     সংবাদ

বিচিত্র

মনের অসুখকে হারিয়ে সেবায় আত্মনিয়োগ

বিবিসি | ২১ মার্চ ২০১৭, ০১:৩৬  

.জেসিকা মে তখন পেশাজীবনের ধাপগুলো বেয়ে তরতর করে উঠছিলেন। আচমকা মানসিক অসুখ হানা দিল। প্রথম সন্তান প্রসবের পরই থাইরয়েড গ্রন্থিতে সমস্যার শুরু। এতে তাঁর মানসিক উদ্বেগের পুরোনো অসুখটা বেড়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী এই নারী বলেন, উদ্বেগ-সমস্যা তাঁর আজীবনের। থাইরয়েডের জটিলতায় সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।
এটা ২০১২ সালের কথা। অসুখ নিয়েই জেসিকা সরকারি চাকরিতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর চিকিৎসক বলেছিলেন, কাজে যোগ দিলে সেরে ওঠার আশা আছে।
তো জেসিকা নিজের সমস্যাটা সহকর্মীদের খুলে বললেন এবং কাজের জন্য স্বস্তিকর একটা সময়সূচি বেছে নিতে চাইলেন। এতে ব্যবস্থাপক ও সহকর্মীরা নাখোশ হলেন, তাঁকে বিভিন্ন কাজ থেকে বাদ দিতে শুরু করলেন। এতে তিনি কিছুটা ভেঙে পড়েন। তবে ফলাফল শেষমেশ ইতিবাচকই হলো। জেসিকা দেখলেন, আশপাশে এ রকম অনেকেই শারীরিক-মানসিক সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছে। ওদের সাহায্য করলে কেমন হয়, সেই ভাবনা তাঁর মাথায় এল।
আর দেরি করেননি। চাকরিটা ছেড়ে এনেবলড এমপ্লয়মেন্ট নামের একটা প্রতিষ্ঠান খুললেন। কাজটা হলো শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত মানুষকে উপার্জনক্ষম কাজ জোগাড় করে দেওয়া। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও অন্যান্য সাহায্য করা।
ক্যানবেরার এই প্রতিষ্ঠান আজ হাজারো মানুষকে চার শতাধিক কাজ পেতে সাহায্য করেছে। প্রতিবন্ধকতা জয় করেই কেউ কেউ হিসাব প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স, মোটরগাড়ি ডাকার সেবামূলক প্রতিষ্ঠান উবার ও অস্ট্রেলীয় সশস্ত্র বাহিনীর মতো জায়গায় চাকরি পেয়েছেন।
২০১২ সালের ডিসেম্বরের এক সোমবার সরকারি চাকরি ছেড়েছিলেন। পরের সোমবারই এনেবলড এমপ্লয়মেন্টে যোগ দেন। উদ্যোক্তা সহায়ক প্রতিষ্ঠান গ্রিফিন এক্সিলারেটর তাঁর পাশে ছিল। তারপরের গল্পটা ধীরে ধীরে এগোনোর। কাজটা কী রকম? অনেকটা নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মতো। অনলাইনে বিভিন্ন চাকরির বিজ্ঞাপন ঘেঁটে প্রার্থীদের সঙ্গে সম্ভাব্য নিয়োগদাতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। তবে কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কথা জেসিকা ও তাঁর সহযোগীরা চাকরিদাতাদের আগে থেকেই ভালো করে বুঝিয়ে দেন, যাতে ওই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষেরা সুবিধাজনক সময়ে কাজ করতে পারেন এবং টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ পান।
জেসিকার প্রতিষ্ঠানটি অলাভজনক নয়, বরং বিপরীত। এটাই তাঁর ব্যবসা। তিনি বিশ্বাস করেন, দাতব্য সহায়তায় প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠতে পারে। এটা তাঁদের সামর্থ্যের অবমূল্যায়নও বটে।
এনেবলড এমপ্লয়মেন্ট যাঁদের চাকরি জোগাড় করে দেয়, তাঁরা বার্ষিক আয়ের ১০ শতাংশ ওই প্রতিষ্ঠানকে এককালীন দিয়ে দেন। জেসিকা বললেন, অস্ট্রেলিয়ায় ৪২ লাখ মানুষ প্রতিবন্ধী। তাঁদের অনেকেরই কাজ করার সামর্থ্য আছে। কিন্তু সেটা জোগাড় করে দিলে অনেক সুবিধা হয়।
জেসিকার প্রতিষ্ঠানের তহবিলে এখন প্রায় ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার আছে। তারা সাবেক সেনাসদস্য থেকে শুরু করে আদিবাসী অস্ট্রেলীয় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে সেবা দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান নেটওয়ার্ক অন ডিজঅ্যাবিলিটির প্রতিষ্ঠাতা সুজান কোলবার্ট বলেন, জেসিকা অস্ট্রেলীয় চাকরির বাজারে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানেও আদর্শের প্রতিফলন দেখিয়েছেন। এনেবলড এমপ্লয়মেন্টের পূর্ণকালীন সাত কর্মীর চারজনই প্রতিবন্ধী। প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ২০১৫ সালের সেরা উদ্যোগ, ন্যাশনাল ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি।
এখন জেসিকার চোখ সামনের দিকে। দেশে ব্যবসাটা আরও সম্প্রসারণের পর বিদেশেও কাজ করতে চান। তবে এই মুহূর্তে তিনি ‘সবচেয়ে সুখী’। বললেন, ‘এখনো উদ্বেগজনিত অসুখটা আছে। এটা কখনোই একেবারে দূর হবে না। তবে আমি সবকিছু মানিয়ে নিয়েই নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে যেতে পারছি।’

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন