পাঁচমিশালি     সংবাদ

পাঠক হাজির

বকুল

১৮ মার্চ ২০১৭, ০০:৩৫  

স্কুলজীবনে কিছু ছাত্রের সঙ্গে আমি পেরে উঠতাম না কখনোই। এদের একজনের নাম বকুল, প্রতিবারই ফার্স্ট হয়। কান দুটো বড় বড়, চোখে চশমা, চেহারা গাধা টাইপের।

আরেকজনের নাম ডায়রিয়া খান। এর সঙ্গেও পারা কঠিন ছিল, অসম্ভব মেধাবী। যদিও এর আসল নাম ছিল আসাদ খান। তবে বছরের অর্ধেক সময় খারাপ ধরনের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত থাকায় এর নাম স্থায়ীভাবে হয়ে যায় ডায়রিয়া খান। এই ডায়রিয়া খান বিজ্ঞানী হবে বলে স্যাররা ভবিষ্যদ্ববাণী করেছিলেন। বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পরই বাবা মারা যাওয়ায় তার পক্ষে পড়াশোনা চালানো আর সম্ভব হয়নি। সে একটি পিঠার দোকান দিয়ে বসে পড়ে। তখন তার নাম হয়ে যায় পাটিসাপটা খান।

তবে বকুল খুব ভালো রেজাল্ট করেই স্কুলজীবন শেষ করল। আমি তার সঙ্গে তেমন সুবিধা করতে পারলাম না। আমি এসএসসি শেষ করলাম মোটামুটি রেজাল্ট করে। এই ধরনের রেজাল্ট যারা করে, এরা বড় হয়ে বিশেষ কিছু হবে এমনটা আশা রাখা যায় না। এদের আচরণে কেরানি ভাব স্থায়ী হয়ে যায়। আমার শুধু আচরণে না, চেহারায়ও কেরানি ভাব স্থায়ী হয়ে গেল। শেষ দিন স্যারদের দোয়া নিতে গেলাম। অঙ্ক স্যার বললেন, দোয়া দিয়েই তো তোকে এই পর্যন্ত এনেছি। না হলে ক্লাস ওয়ানেই রয়ে যেতি ফেল করতে করতে। তবে বকুল খুব প্রশংসা পেল স্যারদের কাছ থেকে। সব স্যার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। তার রেজাল্টে স্কুল গর্বিত।

বকুল খুব ভালো একটি কলেজে ভর্তি হয়ে গানও শিখতে শুরু করল। আমি বিষয়টা তেমন পাত্তা দিলাম না। কিছুদিন পর সে টেলিভিশনে গান গাওয়ার সুযোগ পেল। তার প্রচুর ভক্ত, মেয়েরা তার জন্য পাগল। এসব খবর পেয়ে আমার গায়ে সামান্য জ্বালাপোড়া হলো। একটা ছেলের এত গুণ থাকার দরকার কী? আর এত বড় কানওয়ালা ছেলের প্রতি মেয়েগুলোর পাগল হওয়ারই-বা প্রয়োজনীয়তা কী? এই দেশের মেয়েগুলোর মাথায় সমস্যা আছে, এরা প্রকৃত শিল্পী চেনে না, কান দিয়ে শিল্পী বাছে ইত্যাদি হাবিজাবি বলা শুরু করলাম।

মাঝে মাঝে আসাদের পিঠার দোকানে যাই। সে আমাকে চিনতে পারে না। অন্য কাস্টমারদের মতোই একজন ধরে নেয়। আমিও আর তাকে চেনার চেষ্টা করি না। নিজের চেয়ে নিচে যেসব মানুষ চলে যায়, আমরা স্বভাবতই তাদের আর চিনতে পারি না। এদের চিনলেই ঝামেলা।

কলেজজীবন শেষ হলো। একদিন আসাদ খানের পিঠার দোকানের ওখানে গিয়ে দেখলাম দোকান নেই। সে দোকান ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না।

বকুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে গেল। ছাত্রজীবনের সব ক্ষেত্রেই বকুলকে সবচেয়ে সফল মনে হলো আপাতদৃষ্টিতে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা সবাই হেরে গেলাম তার কাছে। অসংখ্য ভক্ত তার। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় কনসার্ট থাকে। মেয়েরা ‘ম্যারি মি’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ফেসবুকে তার ভক্তের শেষ নেই।

এরপর অনেক দিন কারও কোনো খোঁজ নেই। বকুলের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট অফ। আমি ফোন দিলাম তাকে। বকুলের গলা অন্য রকম শোনাল। সে বলল, কিছু সমস্যায় আছি। তবে শিগগিরই ফিরছি।

সেদিন বিকেলেই বকুল না-ফেরার দেশে চলে গেছে। ইচ্ছামৃত্যু। একটি চিরকুট রেখে গেছে। তাতে লেখা— আমি আর ফিরব না।

খবরটা শুনে আমার মনে হলো, বকুল এই প্রথম হেরে গেল। সব ক্ষেত্রেই সে জিতেছে, শুধু জীবনের কাছে সে হেরে গেছে।

জনরাসেল

ঢাকা।

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন