পাঁচমিশালি     সংবাদ

আবদুল মান্নানের সংগ্রহ

আনোয়ার পারভেজ, বগুড়া | ১৮ মার্চ ২০১৭, ০২:২৪  

চার দশক ধরে আবদুল মান্নান সংগ্রহ করেছেন এমনই দুর্লভ প্রত্নসামগ্রী। ছবি: সোয়েল রানাবগুড়ার মহাস্থানগড়ের কাছেই জন্ম আবদুল মান্নানের। শৈশব কেটেছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী এই মহাস্থানগড় প্রত্নভূমিতেই। শৈশবে মায়ের মুখে গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়তেন। মায়ের মুখে কখনো বেহুলা–লখিন্দর, কখনো রাজা পরশুরামের রাজদরবার বা রাজকন্যা শীলা দেবীকে নিয়ে নানা রূপকথার গল্প শুনে রোমাঞ্চিত হতেন। সব গল্পই পুণ্ড্রবর্ধনকে ঘিরে। রূপকথার এসব গল্প শুনতে শুনতেই একসময় পুণ্ড্রবর্ধনের ইতিহাস জায়গা করে নেয় তাঁর মনের ভেতর। নানাজনের কাছে নানা কাহিনি শোনেন, আর মনের খাতায় তা জমা করে রাখেন। দিনে দিনে মনের খাতায় জমানো ইতিহাসের ভান্ডার বড় হলো। আবদুল মান্নানও স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখলেন। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র আবদুল মান্নান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৭৫ সালে গোটা পুণ্ড্রবর্ধন ঘুরে ঘুরে বিলুপ্ত সভ্যতার প্রত্নবস্তু সংগ্রহ এবং ইতিহাস গবেষণার নেশায় জড়িয়ে পড়েন। সেই যে শুরু, আর থেমে যাননি তিনি। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে ইতিহাস-ঐতিহ্যের খোঁজে পথ থেকে পথে ছুটেছেন। যেখানেই প্রত্ননিদর্শনের খবর পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গিয়ে তা সংগ্রহ করেছেন। পুঁতির দানা থেকে প্রাচীন আমলের পণ্যবিনিময়ে ব্যবহৃত কড়ি, মৃৎসামগ্রী, তামা, পিতল ও ব্রোঞ্জের তৈজস; খাট-পালঙ্ক, দরজা-কপাট—এসব সামগ্রী সংগ্রহ করেন তিনি দিনের পর দিন।
পুণ্ড্রবর্ধনের প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গবেষণাধর্মী বই ইতিহাস পুণ্ড্রবর্ধন লিখেছেন। শখ ছিল ৪২ বছর ধরে পুণ্ড্রবর্ধনের মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর ঘুরে সংগ্রহ করা প্রায় ২ হাজার ৬০০ প্রত্নসামগ্রী নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহশালা গড়বেন। এ জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যোগাযোগও করেন আবদুল মান্নান।
আবদুল মান্নান (ডানে) নিজের সংগ্রহ দিচ্ছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছেকিন্তু আইনি জটিলতায় তাঁর সেই শখ পূরণ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আবদুল মান্নান তাঁর প্রত্নদুনিয়ার ভান্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে হস্তান্তর করেছেন। ১১ মার্চ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেনের হাতে তিনি তুলে দেন চার দশক ধরে সংগ্রহ করা প্রায় ২ হাজার ৬০০ প্রত্নসামগ্রী। আবদুল মান্নানের এসব দুর্লভ প্রত্নবস্তু মহাস্থান জাদুঘরে আলাদা গ্যালারিতে দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
সিঁদুরদানিআবদুল মান্নানের প্রত্নদুনিয়া থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যেসব দুর্লভ প্রত্নবস্তু পেয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, পোড়ামাটির ঢাকনা, ঢাকনাসহ পাতিল ও বাটি, লাল ও কালো রঙের কলসি, ব্রোঞ্জের বাটি, খাড়ুয়া, বালা, লকেট, গলার হার, চুলের কাঁটা, কোমরের বিছা, চিনামাটির থালা, আলাদিনের প্রদীপসদৃশ পাত্র, লোহার মসলা বাটার পাত্র, অলংকার সংরক্ষণের জন্য ছোট বাক্স, কাচের মূর্তি, পাখির প্রতিকৃতি, হুঁকা, ছোট হাস্যবদন বুদ্ধমূর্তি, সাদা পাথরের বটিকা, পিতলের বাটি, থালা ও কুপি, ঘটি, জলদানি, নলযুক্ত পোড়া মাটির কলস, পিতলের রিকশা, কারুকাজখচিত পানদানি, সিঁদুরদানি, রাজাদের ব্যবহৃত হুঁকা, আতরদানি, সুরমাদানি, রুপার মুদ্রা, তামার মুদ্রা, কড়ির মালা, হাড়ের তৈরি নরমুণ্ড মালা, কাঠের মালা, সোনার প্রলেপযুক্ত কয়েন, তামার ফরাসি লিপি, পোড়ামাটির সিলিং (মোহর), নানা রঙের বিটিং (পুঁতি), কারুকাজখচিত নানা মৃৎসামগ্রী, প্রাচীন যুগের মুদ্রা, ধাতব মুদ্রা, প্রাচীন যুগের কালো নিম কাঠের দরজা (কপাট) ও চন্দনকাঠের পালঙ্ক, গুপ্ত, পাল ও সেন আমলের পণ্য বিনিময় ও সাজসজ্জায় ব্যবহৃত পাথর, প্রবাল ও মুক্তার মালা, প্রাচীন যুগের নারীদের অলংকার, লকেট, কোমরের বিছাসহ নানা প্রত্নবস্তু।

পিতলের রিকশাকষ্টের সংগ্রহ স্মৃতি
৪২ বছর ধরে সংগ্রহ করা প্রত্নদুনিয়া নিয়ে কথা হয় আবদুল মান্নানের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে শিবগঞ্জ সদরের এম এইচ ডিগ্রি
কলেজে শিক্ষকতা করেছি।
কিন্তু প্রত্ন সংগ্রহের নেশা ছাড়তে পারিনি।
প্রাচীন সভ্যতার প্রত্নবস্তুর খোঁজে পুণ্ড্রবর্ধনখ্যাত উত্তরবঙ্গের গ্রাম-গঞ্জ, পথে-প্রান্তর ছুটে বেড়িয়েছি। এসব প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করতে নানা তিক্ত স্মৃতি রয়েছে। কোনো প্রত্নবস্তু সহজেই পেয়েছি, কোনোটি সংগ্রহ করতে গিয়ে দিনের পর দিন ধরনা দিতে হয়েছে।’
আবদুল মান্নান বলেন, ‘৪২ বছরে প্রাচীন আমলের রাজা-জমিদারদের ব্যবহৃত কয়েকটি পালঙ্ক সংগ্রহ করেছিলাম। এর মধ্যে প্রায় ১০ বছর আগে লোকমুখে চন্দনকাঠের একটি পালঙ্কের সন্ধান পেয়েছিলাম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এক জমিদারবাড়িতে। কয়েক শ বছরের পুরোনো পালঙ্কটি হেফাজতে ছিল জমিদারদের এক পাইক-পেয়াদার কাছে। প্রত্ন জাদুঘর গড়ার কথা শুনে সহজেই পালঙ্কটা দিয়েছিলেন তাঁরা।’
বুদ্ধমূর্তিময়ূরপঙ্খি, বাঘ, সিংহ, ঘোড়া ও মানুষের প্রতিকৃতি অলংকৃত প্রাচীন আমলের কয়েকটি কাঠের দরজা সংগ্রহ করেছিলেন তিনি উত্তর জনপদ ঘুরে। এর মধ্যে রাজা-বাদশাহদের ব্যবহৃত একটি দরজার সন্ধান পেয়েছিলেন তিনি নওগাঁ এলাকার এক রাজবাড়িতে। দরজাটা সংগ্রহ করতে নানা বিপত্তি হয়েছিল তাঁর।
আবদুল মান্নান বলেন, ‘মহাস্থানগড়ের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে মাটি খুঁড়তে গিয়ে ৩০০ বছরের পুরোনো কয়েকটি কারুকাজ–শোভিত মৃৎপাত্র মিলল। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে মৃৎপাত্রগুলো সংগ্রহশালায় নিতে চাইলাম। গৃহকর্তা রাজি হলেন না। দিনের পর দিন ধরনা দিলাম। প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরলাম। হাল ছাড়লাম না। ১৫ দফা ধরনা দেওয়ার পর মথুরা শেখ নামে ওই ব্যক্তি প্রত্নবস্তুগুলো দিতে রাজি হলেন। বিপুল প্রত্নভান্ডার সংগ্রহ করতে এমন নানা তিক্ত স্মৃতি-অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।’
আবদুল মান্নান আরও বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্য আর প্রত্নবস্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই বিপুল প্রত্নভান্ডার সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ইচ্ছা ছিল এগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা তৈরি করবেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মহাস্থান জাদুঘরে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, আবদুল মান্নানের প্রত্নদুনিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ব্রিটিশ শাসনামল পর্যন্ত নানা দুর্লভ প্রত্নসামগ্রী মিলেছে। এসব প্রত্ননিদর্শন অত্যন্ত মূল্যবান এবং সভ্যতার ইতিহাসের সাক্ষী।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, আবদুল মান্নান ৪২ বছর ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা প্রত্নভান্ডার হস্তান্তর করে দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সংগ্রহ করা এসব প্রত্নসামগ্রী মহাস্থান জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।

কড়ির মালাপ্রকৃতিপ্রেমী আবদুল মান্নান
আবদুল মান্নান সম্প্রতি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। ইতিহাস গবেষণা ও প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ ছাড়াও তিনি দুনিয়া ঘুরে কয়েক শ বিলুপ্ত ও দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদ, ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের চারা সংগ্রহ করে বাগান ও নার্সারি গড়েছেন। এসব বিলুপ্ত ও দুর্লভ প্রজাতির গাছগাছড়া নিয়ে গবেষণা করছেন। বগুড়াসহ দেশজুড়ে সবুজ প্রকৃতি গড়ার কাজ করছেন। এসব কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। অসুস্থ পাখপাখালির চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করার মাধ্যমে ‘প্রাণীবন্ধু’ হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি।

পাঠকের মন্তব্য (২)

  • Md.Habibuzzaman

    Md.Habibuzzaman

    আরও একজন সাদা মনের মানুস। এদের জন্যই দেশ এখনো টিকে আছে।সালুট আপনাকে
     
  • M. Mondal

    M. Mondal

    অশেষ শ্রদ্ধা এই মানুষটির প্রতি। এমন সব মানুষ থাকলে অনুপ্রেরণার জায়গার অভাব হয় না। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি।
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন