পাঁচমিশালি     সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধের না-জানা ঘটনার একটি

অধ্যাপক তাহমীনা বেগম | ১১ মার্চ ২০১৭, ০১:৫৫  

অলংকরণ: তুলিরাজেন্দ্র আচার্য্য, সবাই তাঁকে চেনেন রাজেন্দ্র কবিরাজ নামে। পেশার কারণে কবিরাজ হিসেবেই সবার প্রিয়, সবার পরিচিত।
কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুরের সরারচর বাজারে তাঁর ওষুধের দোকান। কাছেই মিরাপুর গ্রামে তাঁর বাড়ি। ছোটবেলায় দেখতাম ছোট-বড় সবাই অসুখ হলে তাঁর ওষুধ নিয়ে যেতেন। সবার কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। তাঁর দোকানে ঢুকতাম মাঝে মাঝে, কাঠের আলমারিতে সাজানো বড় বড় শিশিতে কালো রঙের ওষুধ রাখা থাকত। দোকানের পেছনে থাকত অনেক গাছের পাতা, বাকল, ডাল। হামানদিস্তায় কেউ একজন পাতা গুঁড়া করছেন। বড় বড় কড়াইয়ে জ্বাল হচ্ছে পাঁচন, ঝাঁজালো গন্ধ। কবিরাজবাবু খুব আমুদে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন, সবার খুব প্রিয়।
১৯৭১। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলছে; হানাদার বাহিনী সরারচর বাজারে ক্যাম্প করেছে। রাজাকারেরা তাদের নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে যাচ্ছে ও লুটপাট করছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে অত্যাচার করছে। মানুষ মারছে। অনেকেই দূরের গ্রামে, আত্মীয়ের বাড়ি আশ্রয় নিয়েছে। কেউ বা ভারতে চলে গেছে। সবাই রাজেন্দ্রবাবুকে বললেন অন্য কোথাও চলে যেতে। তিনি বললেন, ‘আমি সবার চিকিত্সা করি, আমাকে কে মারবে? আর এই দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। মরতে হলে এ দেশেই মরব।’
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি। রাজেন্দ্র কবিরাজ তাঁর দুই ছেলেসহ খেতে বসেছেন। দুপুরের খাবার। পাকিস্তানি বাহিনী আর রাজাকারেরা গ্রাম ঘিরে ফেলল। দুই ছেলেসহ তাঁকে এবং গ্রামের সব পুরুষ মানুষকে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করল। তাঁর বড় ছেলে গণেশ আচার্য্যের স্ত্রী প্রথম সন্তানের মা হতে চলেছেন তখন। স্বাধীনতার পর ছেলে হলো, নাম রাখা হলো সজল আচার্য্য। এখন সজল সরারচর বাজারে হোটেলের ব্যবসা করেন। এর মাঝখানে একটা ঘটনা বলার জন্য এই লেখা।
আশির দশকের প্রথম দিকে আমাদের পারিবারিক অ্যালবামে ছবি দেখছিলাম। আমার বড় মামার সঙ্গে এক তরুণের ছবি দেখে মায়ের কাছে জানতে পারলাম রাজেন্দ্র কবিরাজের ছেলে গণেশ আচার্য্য! বড় মামার সঙ্গে পড়তেন। ক্লাস এইট বা নাইনে পড়ার সময়কার ছবি। ছবিটা একটু মলিন। তারও বেশ কয়েক বছর পরে একদিন সজল এসে আমার মাকে বলল, ‘আপনাদের কাছে আমার বাবার ছবি আছে শুনলাম। ছবিটা দেবেন, দেখব বাবা কেমন ছিলেন। বাবাকে তো দেখিনি...।’
দুঃখজনকভাবে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি তোলা সেই ছবি এত দিনে নষ্ট হয়ে গেছে। সজল তার বাবা কেমন ছিলেন দেখতে পেল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করেছেন এমন অনেক বাবার সন্তান—যাঁরা যুদ্ধের পরে জন্ম নিয়েছেন তাঁদের একজন সজল। বাবাকে না দেখার, বাবা কেমন ছিল, না জানার হাহাকার সজলের মতো অনেকের হৃদয়জুড়ে আছে। তাঁদের অন্তরের বেদনা অসীম। তা নিয়েও সজল আচার্য্য, তার মা এবং অন্যরা প্রত্যাশা করে, আমাদের এই স্বাধীনতা অক্ষয় হোক, এই দেশের মানুষ শান্তিতে– সুখে থাকুক।
লেখক: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন