পাঁচমিশালি     সংবাদ

যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা জানলাম

০৫ মার্চ ২০১৭, ০০:৪০  

যাদের বয়স এখনো ১৮ হয়নি। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। কেমন করে জেনেছে তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সে কথাই তুলে ধরা হলো।

অদিতি মজুমদারস্বাধীনতার ডাক
অদিতি মজুমদার
ছোটবেলায় কোনো এক মার্চ মাসে টেলিভিশনে দেখেছিলাম, একজন মানুষ আঙুল নেড়ে বলে যাচ্ছেন। প্রায় সময় তাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যেত। তখনো বুঝিনি উনি কে এবং তাঁর কথা। শুধু দাদুকে বলতাম, ‘দাদু, আপনাকে টিভিতে দেখাচ্ছে!’ দাদু কথাটা শুনে হাসত আর বলত, ‘ওনার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন।’ তখনো ভালোমতো বুঝতে শিখিনি বলে বুঝতে পারিনি এ ডাক আবার কিসের ডাক!

বয়স আরেকটু বাড়তেই যখন সবকিছু বুঝতে শুরু করলাম, তখনই বুঝতে পারলাম স্বাধীনতা ঘোষণার তাৎপর্য। সে সময় ঠাকুরমা ও ঠাকুরদার কণ্ঠে শুনেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে হায়েনাদের নৃশংসতার কথা। তারা বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে দাদু যে ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করত, সেখানে কিছু পাকিস্তানি দালাল দাদুকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। অগত্যা মে মাসে দেশ ছেড়ে বাবা আর বড় পিসিকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় দাদু। দাদু ঠাকুরমাকে রেখে যায় পটিয়ার একটি বড়ুয়া পাড়ায়। তখন আমার গর্ভবতী ঠাকুরমার সঙ্গে ছিল মেজো কাকা ও তিন পিসি। ঠাকুরদার মুখে শুনেছি কত কষ্ট করে নৌকায় চড়ে, হেঁটে তাঁকে ভারত পৌঁছাতে হয়েছিল। সেই সঙ্গে চলতি পথে দেখতে পাওয়া হায়েনাদের বর্বরতার কথাও শুনেছি ঠাকুরদার কাছে। আর ঠাকুরমা বলতেন রেডিওতে প্রতিদিন খবর শুনে কতটা ভয় আর আতঙ্কে তাঁদের দিন কাটত। এভাবেই ঠাকুরমা আর ঠাকুরদার কাছ থেকেই আমার মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পাঠ নেওয়া।
এরপর বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পাঠ্যবইয়ে পড়েছি মুক্তিযুদ্ধের কথা। শুধু পাঠ্যবইয়ের অল্প কিছু অংশ পড়ে যেন মন ভরছিল না। তাই ধীরে ধীরে হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণি, দেয়াল, জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি, আনিসুল হকের মা, জাফর ইকবালের আমার বন্ধু রাশেদ, সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেডসহ আরও বেশ কিছু বই পড়ে অনুভব করলাম মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা।
চট্টগ্রাম

আরাফাত চৌধুরীচোখ দিয়ে পানি পড়ছিল
আরাফাত চৌধুরী
ছোটবেলায় একদিন বাবা আমাকে বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি দেশাত্মবোধক গান গেয়ে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেছিলাম। সেদিন বাবা খুব খুশি হয়েছিল। অনুষ্ঠানের শেষে সবাইকে একটি ডকুমেন্টারি দেখানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের একটি বিখ্যাত ডকুমেন্টারি দেখে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়েছিল। কিন্তু আমি ভিডিওর কোনো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাড়ি ফিরেই বাবার কাছে জানতে চাইছিলাম, বাবা আমাকে নিয়ে বসে বলতে লাগলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ঘটনা, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা ও বর্বরতার বীভত্স ইতিহাস। বাবার কাছ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। এরপর কেন যেন আমার মনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানার তৃষ্ণা আরও বেড়ে গেল। একদিন বাবা আমাকে আমার জন্মদিনে তিনটি বই উপহার দিয়েছিলেন। বই তিনটি ছিল আমার বন্ধু রাশেদ, জোছনা ও জননীর গল্প, একাত্তরের দিনগুলি। বই পেয়ে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। আমি সানন্দে বই তিনটি চার দিনে পড়ে শেষ করে ফেললাম। এরপর যখন সুযোগ পেয়েছি, তখনই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। ক্লাস এইটে পড়ার সময় স্কুলের বন্ধুরা মিলে একজন মুক্তিযোদ্ধার মুখ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সত্য কাহিনি শুনব বলে িঠক করলাম। যেই ভাবা, সেই কাজ। অধ্যক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সবকিছু আয়োজন করে ফেললাম। আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলায় থাকত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমরা তাঁকে আমাদের স্কুলে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনিও বেশ খুশি মনে রাজি হয়ে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বীরত্বপূর্ণ বিভিন্ন অভিযানের ঘটনা তিনি আমাদের জানালেন।
কুমিল্লা

তথাপি আজাদথ্রি নট থ্রি
তথাপি আজাদ
‘বড় ভাইয়ের লাশ বাড়িতে আসার পর শুনলাম “থ্রি নট থ্রি” রাইফেলের গুলি ডান চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমি তখন অত কিছু বোঝা শিখিনি। শুধু এইটুকু বুঝলাম, বড় ভাইকে পাকিস্তানিরা ভয়ংকরভাবে মেরেছে।’
চোখ বড় বড় করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনছিলাম। তাঁর চোখে জল দেখেও কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে ফেলি, ‘তারপর?’
মুক্তিযুদ্ধও নাকি এমনই ছিল। নেশার মতো। জয় ছিনিয়ে না আনা পর্যন্ত বাঙালি ক্ষান্ত হতে পারেনি। তাহলে সেই যুদ্ধের গল্পে তো আমার কৌতূহল হবেই। বাবা অবশ্য সে আশা অপূর্ণ রাখেননি। কিনে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর অসংখ্য বই। কোনোটা পড়তে গিয়ে গা শিউরে উঠেছে আবার অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাস্ত হওয়ার কাহিনি পড়ে আনন্দে নেচে উঠেছি। মনে মনে ভেবেছি, ‘ইশ্! পাকিস্তানিরা কী বোকাটাই না ছিল! বোকা না হলে কি বীর বাঙালির সঙ্গে লড়তে আসে?’
তবে আমার বন্ধু রাশেদ চলচ্চিত্র দেখে মনে হয়েছিল পাকিস্তানিরা বোধ হয় পিশাচ ছিল। তাই তো তাদের হত্যার তালিকা থেকে কেউই বাদ যায়নি। ছোটবেলা থেকেই বাবা বলে এসেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ দেখোনি তুমি। তাই বাঙালি হিসেবে তোমার প্রধান কর্তব্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে অক্ষরে অক্ষরে জানা। অনুভব করা। তবেই দেশের প্রতি তোমার মমতা জন্মাবে। দেশকে ভালোবাসতে পারবে।’
তাই যেখানেই কোনো মুক্তিযোদ্ধা দেখি, দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে তাঁর কথা শুনি। বই পড়ে যতটা অনুভব করি, তারচেয়ে নিজ চোখে মুক্তিযুদ্ধ দেখা এবং স্বজন হারানো মানুষের গলার স্বর, চোখের কোণে জমা জল দেখলে বেশি আক্ষেপ হয়। কেন একাত্তরে আমি ছিলাম না! মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীর বুকে তো মুক্তিযোদ্ধারা চিরদিন থাকবেন না। কেউ চাইলেও তাঁদের একবার ছুঁয়ে দেখতে পারবে না। কিন্তু আমি সৌভাগ্যবান। ছুঁয়ে দেখতে পেরেছি মুক্তিযোদ্ধাদের আর শুনতে পেরেছি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস।
রাজশাহী

মিনহাজ আহমদআমার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা
মিনহাজ আহমদ
ছোট থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও এর ইতিহাস সম্পর্কে আমি জেনেছি বেশ কিছু আলাদা মাধ্যম থেকে।
বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন শ্রেণিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর মূল্যবোধ, ইতিহাস সম্পর্কে বেশ কিছু গল্প, প্রবন্ধ, রচনা রয়েছে, যা পড়ে আমি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছি এবং সে বিষয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আলোচনা থেকেও অনেক ঘটনা ও পরিস্থিতি উঠে এসেছে, যা আমাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে।
আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি পারিবারিক আড্ডায় অথবা জিজ্ঞেস করা হলে নানা সময়েই তাঁর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচারণা করতেন এবং তখনকার ঘটনা বলতেন। তাঁর গল্পাকারে বলা ঘটনাগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আক্ষরিক অবস্থা সম্পর্কে আমার ধারণাগুলো আরও স্পষ্ট করেছে।
সারা বছর, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত দিবসগুলো পালনের সময় টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে অনুষ্ঠান, পত্রপত্রিকায় লেখা, দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়, যা শুনে এবং দেখে আমি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সে সময়ের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা নানান ইতিহাস, উপন্যাসের বই আমাকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা জানিয়েছে, যা আমার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।
তবে জানার আছে এখনো অনেক কিছু।
কিশোরগঞ্জ

সুনন্দিতা চৌধুরীবাবা গল্প বলা শুরু করলেন
সুনন্দিতা চৌধুরী
মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমি প্রথম জেনেছিলাম তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়। তখন আমাদের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি অধ্যায় ছিল। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের আগের ঘটনা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের বর্ণনা সংক্ষিপ্তভাবে লেখা ছিল।
যদিও ওই অধ্যায় পড়েই আমি প্রথম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছিলাম, তবুও অত ছোট বয়সে ওই লেখা পড়ে আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারিনি। তাই বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলাম।
বাবা মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা শুরু করলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, ভোটে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরেও তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ, পঁচিশে মার্চ রাতে নিরীহ মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের ঝাঁপিয়ে পড়া, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী ভূমিকা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা, ভারতের সহযোগিতা, ষোলোই ডিসেম্বরে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের ঘটনাসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ঘটনার বিশদ বিবরণ দেন বাবা। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পেয়েছিলাম।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় দিবসগুলোতে স্কুলের অনুষ্ঠান, পত্রিকার বিশেষসংখ্যা, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আয়োজন থেকেও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি।
একটু বড় হয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা অনেক বই পড়েছি। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি পড়ে মনে হয়েছে, আমিই এখন ১৯৭১ সালের অনিশ্চিত দিনগুলো পার করছি, একাত্তরের চিঠি পড়ে মনে হয়েছে, প্রতিটি শহীদই আমার পরম আপনজন, আনিসুল হকের মা পড়ে মুক্তিযুদ্ধকে অন্যভাবে অনুধাবন করেছি। তবে গল্পে গল্পে সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছি হুমায়ূন আহমেদের স্যারের জোছনা ও জননীর গল্প বইটি পড়ে।
সিলেট

পাঠকের মন্তব্য (১)

  • hidden

    প্রথম আলোতে নিজের লেখা দেখার আনন্দ সত্যিই অন্যরকম।।
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন