মতামত     সংবাদ

পাকিস্তান

জবাবদিহির বালাই নেই

আফ্রাসিয়াব খটক | ২১ মার্চ ২০১৭, ০০:৫৮  

আফ্রাসিয়াব খটকপাকিস্তানে কিছু প্রকৃতিস্থ মানুষ আছেন, তাঁরা ছাড়া পাকিস্তানে জবাবদিহির প্রশ্নে যৌক্তিক ও ন্যায্য কথা কেউ বলেন না। এর কারণটাও দৃশ্যমান। দেশটিতে জবাবদিহির পূর্বশর্তগুলো যেমন, সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব, আইনের শাসন ও নাগরিকদের সমতার মতো প্রপঞ্চগুলোর অস্তিত্ব নেই। ‘হলি কাউ’ আগেও এবং এখনো আইনের ঊর্ধ্বে, এমনকি তাঁরা সমালোচনারও ঊর্ধ্বে।
ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও তার স্বাধীনতার বিস্তৃতির সঙ্গে জবাবদিহির প্রপঞ্চ ব্যাপকভাবে বিকৃত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধান টক শোগুলোতে যা হয় তাকে মিডিয়া ট্রায়াল আখ্যা দিলেও কম হবে। এর অনেক কারণ রয়েছে। একটি কারণ হচ্ছে, পাকিস্তানের আধা গণতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে জাতীয় আখ্যানের সকল পর্যায়ে গভীর রাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেকোনো বিষয়ে আইএসপিআরের কথাই শেষ কথা। আর সেটাও যদি যথেষ্ট না হয়, তাহলে তথাকথিত প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা জগতের যেকোনো বিষয়ে গভীর রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশে রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রদের চেয়ে পিছিয়ে থাকেন না। যার মাধ্যমে চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, বিশ্বের যেসব দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, সেখানে মানহানি ও ক্ষতি-বিষয়ক কঠোর আইন থাকে। যেসব গণমাধ্যম মিথ্যা খবর প্রচার করে লোকের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায় বা সহিংসতা উসকে দেয়, তাদের আদালতে বিচার হয়। সম্প্রতি লন্ডনের এক আদালত যুক্তরাজ্যে দেখা যায় এমন এক টিভি চ্যানেলকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছেন। এর বিপরীতে পাকিস্তানের টর্ট ও মানহানি আইন এতটা শক্তিশালী নয় যে তা গণমাধ্যমকে এ রকম নেতিবাচক প্রচারণা থেকে বিরত রাখতে পারে। তৃতীয় কারণটি এ রকম যে আমজনতা ও রাজনৈতিক কর্মীরা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছে এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদের ত্যাগও কম নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই ত্যাগের মহিমাকে সংবিধান ও সংসদের শ্রেষ্ঠত্বে রূপান্তরিত করতে পারেনি। রাজনৈতিক নেতারা পৃষ্ঠপোষকতা পান, যার কারণে তাঁরা মূলত উচ্চ নৈতিক অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেন না। রাজনৈতিক নেতারা প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার ভাগীদার হয়েই খুশি।
কথা হচ্ছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর লাগামহীন দুর্নীতি দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, ঔপনিবেশক শাসনের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত ও দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য গঠিত নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু করতে পারেনি। জবাবদিহি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের বেলায় প্রযোজ্য। তারা কিছু মানুষকে বেছে বেছে শিকার বানায়। অন্যদিকে কিছু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তো জবাবদিহির ব্যাপারটা একেবারেই নাকচ করে দিয়েছে। একদম সম্প্রতি হয়েছে কি, এই জবাবদিহির ব্যাপারটা প্রতিপক্ষকে আঘাত করার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত হুসেইন হাক্কানির একটি নিবন্ধ নিয়ে যে হইচই হলো, তাতে পাকিস্তানে জবাবদিহির ধারণার বিকৃত রূপটি বেরিয়ে আসে। কিছু মহান ব্যতিক্রম ছাড়া রেটিং-বুভুক্ষু ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। যুক্তি ও ন্যায্যতার ধার তারা ধারল না। অন্তত একটি উর্দু চ্যানেলের টিকারে হাক্কানির ফাঁসি দাবি করা হয়। এখন আমরা জানি, হাক্কানির বিরুদ্ধে এফআইআর বা অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি বা তাঁকে বিচারের আওতায়ও আনা হয়নি। মানুষ কীভাবে তাঁর বা অন্য কারও সম্পর্কে এমন কথা বলে পার পেয়ে যেতে পারে? কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, অ্যাবোটাবাদ কমিশনের প্রতিবেদন হাক্কানির নিবন্ধের বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারবে, কিন্তু তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এতে যেমন বিতর্কের সমাপ্তি ঘটত, তেমনি কার কী দায় আছে, তার ফয়সালা করতে পারত। বিচারের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতো। আর প্রতিবেদনে যদি দেখা যায়, হাক্কানির কাজে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে, তাহলে তাঁর বিচারের ব্যাপারে কারও আপত্তি থাকবে না। কিন্তু সেটা যেন অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। ব্যাপারটা কি বিস্ময়কর নয়? আমরা কি এমন জায়গায় আগে যাইনি? পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে ১৯৭১ সালে দেশটির ভেঙে যাওয়া। সুপ্রিম কোর্টের হামুদুর রহমান কমিশন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু এই প্রতিবেদন পাকিস্তানের ভেতরে কখনো প্রকাশিত হয়নি, কারণ, তখনকার রাজনৈতিক সরকার (ধারণা করা হয়, সবচেয়ে শক্তিশালী) জেনারেলদের বিচার করার সাহস দেখায়নি।
দেশটির সংবিধান যারা রদ করল, পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের বিচার করতে পারল না, জবাবদিহি সম্পর্কে এর চেয়ে বড় রূপকথা আর কী হতে পারে! পাকিস্তানের সংবিধানের ৬ ধারা অনুসারে সংবিধান রদ করা দেশদ্রোহের শামিল, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এমনকি আমরা যদি জেনারেল আইয়ুব খান ও জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন জারির ঘটনা ভুলেও যাই, তাহলেও অন্তত চারবার সংবিধান রদ করা হয়েছে। তবে একবারই গুরুত্বের সঙ্গে সংবিধান রদের বিচারের চেষ্টা হয়েছে, সেটা হলো বছরখানেক আগে জেনারেল মোশাররফকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর আমরা দেখলাম, নির্লজ্জের মতো কায়দা করে মোশাররফকে বিচারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হলো। মজার ব্যাপার হলো, মোশাররফ এ নিয়ে দম্ভও করেছেন। ব্যাপারটা হলো, পাকিস্তানে সংবিধান ভাঙার চেয়ে ট্রাফিক সংকেত ভাঙা গুরুতর অপরাধ।
জবাবদিহির রূপকথার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, পাকিস্তানে সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করা নিয়ে উদ্ভট বিতর্ক হচ্ছে। সব মাধ্যমের মতো সামাজিক মাধ্যমেরও সুবিধা-অসুবিধা আছে। শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে এটি গণমাধ্যমের কর্তৃত্বকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতিতে ভিন্নমত দমন প্রায় অসম্ভব। এটা নিপীড়িত মানুষের ক্ষমতায়ন করেছে। এই ফোরামে এখন অনেক কিছুই তোলা যায়, যা আগে কখনোই তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যমে স্থান পায়নি। কিন্তু চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের মতো গোষ্ঠীগুলো দুরভিসন্ধিমূলকভাবে এটা ব্যবহারের চেষ্টা করছে। সাইবার অপরাধ দূর করতে আইন করতে হবে, তা নিয়ে কারও দ্বিমতের অবকাশ নেই। সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করতেই ব্লগারদের অপহরণ ও তার পরবর্তী ফ্যাসিস্ট প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সাইবার অপরাধের মূলোৎপাটন এর লক্ষ্য নয়।
সর্বত্র জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের কার্যকর ও তেজি সাংবিধানিক ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে বেদনাদায়ক ও সমস্যাজনক ব্যাপারগুলো সমাধান করার জন্য ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, পাকিস্তানি দৈনিক দ্য নেশন থেকে নেওয়া।
আফ্রাসিয়াব খটক: আঞ্চলিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন