মতামত     সংবাদ

বিদেশি বিনিয়োগ ও বিমানবন্দরের মশা

এ কে এম জাকারিয়া | ২০ মার্চ ২০১৭, ১৩:৩৪

বিদেশি বিনিয়োগ পেতে আমাদের চেষ্টার শেষ নেই। গত বছর জানুয়ারিতেই আমরা ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পলিসি সামিট-২০১৬’-এর আয়োজন করেছি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘বাংলাদেশ একটি সুন্দর দেশ। আসুন, এখানে বিনিয়োগ করুন। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশীদার হওয়ার এখনই যথার্থ সময়।’ আমাদের মতো দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কাছেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি যে প্রাধান্য পাওয়া একটি দিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছেন। বিদেশ সফরে বা দেশে বিদেশি কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সব সময়েই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সরকারের তরফে নানা উদ্যোগে কথা আমরা শুনে আসছি। বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা, বিনিয়োগ বোর্ড বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, পিপিপি দপ্তর বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং গ্রাহকদের যথাযথ সেবা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ‘একক সেবা স্থান’ (ওয়ান স্টপ সেন্টার) সুবিধা নিশ্চিত করার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়েই বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? আমরা এত কিছু করছি, এত পদক্ষেপ নিচ্ছি, তার যথাযথ ফল কি মিলছে?

‘ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়ন: প্রধান নীতিগুলোর সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার’ শিরোনামে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে গত শনিবার। সেখানে দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমাদের টনক নড়াবে কি না কে জানে! ‘আমি যদি বিদেশি বিনিয়োগকারী হতাম, তাহলে বিমানবন্দর থেকেই দেশে ফেরত যেতাম। বিমানবন্দরে নেমে আমাকে যদি ভিসা পেতে এক ঘণ্টার বেশি লাগত, ব্যাগ পেতে দুই ঘণ্টার বেশি লাগত, মশার কামড় খেতে হতো...এটা আমাদের দেশ সম্পর্কে ভালো পরিচয় নয়।’ বোঝা যাচ্ছে, আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর, এমনকি এর মশাও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল না হয় হবে, কিন্তু বিমানবন্দর বদলানোর কী হবে? এর মশাই-বা তাড়াবে কে?

আমরা আমাদের দেশে আমেরিকান, জাপানি, চীনা, কোরীয়, সৌদি বা ইউরোপীয় বিনিয়োগ চাই। এসব দেশের বিনিয়োগকারীদের আমাদের দেশে আমন্ত্রণ জানাই। কিন্তু বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানাই বিড়ম্বনা, অপেক্ষা আর মশার কামড় দিয়ে। তাঁদের কী দায় পড়েছে যে আমাদের বিমানবন্দরে ভিসার আশায় অপেক্ষা করে তাঁরা মশার কামড় খাবেন!

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সেমিনারে নাসিম মঞ্জুর ছয়টি প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে বিমানবন্দরের ইস্যুটিকে তিনি পাঁচ নম্বরে রেখেছেন। বোঝা যায়, বিমানবন্দর ইস্যুটি তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নাসিম মঞ্জুর নিজে এ দেশের একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী এবং সে হিসেবে একজন ভুক্তভোগীও। এখানকার বাস্তবতা তাঁর ভালোই জানা। নাসিম মঞ্জুর ঢাকা বিমানবন্দরের যে দশা তুলে ধরেছেন, তা আমাদের কারও অজানা নয়। আমরা যারা এ দেশের সাধারণ নাগরিক বা যাঁরা নাসিম মঞ্জুরের মতো দেশীয় উদ্যোক্তা, তাঁদের না হয় আর কোনো পথ নেই এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া। কিন্তু বিনিয়োগ নিয়ে আসবেন যাঁরা, তাঁরা তা মানতে যাবেন কোন দুঃখে! আর যে দেশের বিমানবন্দরে একজন বিনিয়োগকারীকে ভিসার জন্য অপেক্ষা করতে ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়, লাগেজ পেতে দুই ঘণ্টা পার হয়, সইতে হয় মশার কামড়, সেই দেশে আমরাই-বা বিদেশি বিনিয়োগকারীকে ডাকি কোন মুখে!

বিদেশি বিনিয়োগ আনতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, অবকাঠামো তৈরি, সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, উদার বিনিয়োগনীতি, ট্যাক্স হলিডে, যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর রেয়াত বা অর্থের উৎস জানতে না চাওয়া—এসব উদ্যোগ ও নীতি নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু একটি দেশের অভ্যর্থনাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত বিমানবন্দরের পরিস্থিতিও যে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমাদের বিবেচনায় আছে বলে মনে হয় না।

এই সেমিনারে অর্থমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অন্য বক্তারাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের কিছু কিছু দাবি ও পরামর্শ লিখে নিয়েছেন বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর নোটে বিমানবন্দরের বিপর্যয়কর দশা বা মশার কামড়ের বিষয়টি জায়গা পেয়েছে কি না, আমরা জানি না। আর যদি পেয়েও থাকে, অর্থমন্ত্রী কি এ ব্যাপারে আদৌ কিছু করতে পারবেন? বিমানবন্দর নিয়ে লেখালেখি তো কম হয় না, কিন্তু কাজ তো কিছুই হয় না। বিমানবন্দর নিয়ে সম্ভবত কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক
akmzakaria@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য (১১)

  • Mominul Islam

    Mominul Islam

    This is very important issue. আমরা খুবই অসহায়।
     
  • hidden

    I am working in a Multinational: Here we are just surviving. PM is telling to invest but what we have given to the investors? we foreign companies go for Boiler license, Generator license, environment licence, fire license, what not..govt. clerk to high officials ask for money, we cannot save our job for our country corruption. Requesting prime minister, (I don't know it will work or not), when govt. peoples salary was poor they were happy with small amount of bribe, not they are asking 4/5 times more bribes and harass. Do you know if we cannot arrange anything with the actual fees, what foreign management tells? I don't know if it touches you!! Sometimes govt. people give the reference of Finance Minister Muhit, that taking of additional money is not problem. They also are telling top people are taking of the shares. Is it posible to survive in this sector with pride. Day by day we are becoming minnows and feeling shame.
     
  • afsar raj

    afsar raj

    আমি মোটামুটি কয়েকটি বিমানেই ট্রাভেল করেছি বাংলাদেশ বিমান ব্যতিত, সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারী ইউ এস বাংলায় মাস্কাট এসেছি, আর প্রথম বারের মতো বিমানের ভিতর প্রচুর পরিমানে মশার কামড় খাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা পেয়েছি। আর আমাদের বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে যারা আছে এদের কাজের গতি একেবেরেই কম, আশার কথা হলো গত ৪ বছর আগের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো হয়েছে তবে আরো ভালো করা সম্ভব।
     
  • Milsha

    Milsha

    পৃথিবীর যে কোন উন্নত/মধ্যম উন্নত দেশের বিমানবন্দরে গেলে কোথাও ব্যাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়না। ইমিগ্রেশান ডেস্ক পার হলেই দেখা যায় ব্যাগেজ বেল্টে ঘুরছে। আর বিমাননন্দর হতে বের হলে সুশৃংখল পরিবেশ যেখানে যে কেউ একটি ট্যাক্সি ডেকে নির্ভয়ে যে কোন জায়গায় চলে যেতে পারে। এমনকি আমাদের পাশের কোলকাতা, দিল্লী, কাঠমান্ডু আর কলম্বো এ ব্যাপারে আমাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। আমরা করে কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হব?
     
  • Shahed Parvez

    Shahed Parvez

    গত ১০ বছরে মশা মারার কোন উদ্যোগ কোন কর্তৃপক্ষ নিয়েছে বলে শুনিনি। বিমানবন্দরের বিপর্যয়কর দশা বা মশার কামড়ের বিষয়টি নিয়ে এই লেখা পর্যন্তই শেষ, বড় বড় ঠাকুরেরা বড়জোড় একটু গা নাড়া দেবেন, তারপরে আবার মশা আর অব্যবস্থার বিজয়কেতন উড়বে। আমাদের বিমানবন্দরে গেলে খারাপ লাগার ভাবটা শুরু হয় গেট দিয়ে ঢোকার সময়টা থেকে, মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের সাথে সবার গণহারে অশোভন আচরণ, র‌্যাপিং / ট্রলি / ওজন / ফর্ম পূরনের সময় দালালের টোপ বা লজ্জাহীনভাবে বখশিশ দাবী, ইমিগ্রেশন পুলিশের গা ছাড়া ভাবে সময় সময় নষ্ট করা বা সবার সামনে টাকার বিনিময়ে লাইনের পেছনের লোকের কাজ আগে করা, এভাবে শুধু বলে যাওয়া যাবে, কিন্তু প্রতিকার হবে না।
     
  • engshamim

    engshamim

    আমাদের দেশের বড় বড় সমস্যা সমাধান হচ্ছে, তাহলে বিমান বাংলাদেশ আর বিমানবন্দর কেন ঠিক হয় না?
     
  • বিপ্লব ( কুয়াকাটা )

    বিপ্লব ( কুয়াকাটা )

    এ দেশের করতা ব্যক্তিরা, মন্তরিরা,বড় আমলারা যারা বিনিয়গের নিতিমালা ঠিক করে তারা সদা ভি আই পি টারমিনাল দিয়ে আসা যাওয়া করে তাই আসল ভোগান্তি তারা জানে না । ভি আই পি টারমিনাল বনধ করে দেয়া হলে হয়ত কিছু পরিবরতন আসবে
     
  • hidden

    they can change the name only,not the quality of the airport
     
  • Najim Ahmed- KSA.

    Najim Ahmed- KSA.

    জাতের মানুষ কুড়ে ঘরেও হাসিমুখে সাগতম জানায়। প্রথমত এই বিমানবন্দর আউট ডেটেড। আর সেখানে যারা চকারি করেন তাদের মনে রাখা উচিত যে, তারা বেতন নিচছেন। মশা-মাছির দোষ দেওয়া উচিত নয়। ওখানে যারা দায়িততে আছেন তাদেরকে এডুকেটেড করে তোলা। মনে হয় তারা ভাল কিছু চোখে দেখেনি। তাদের ব্যবহার এমন যেন জংগল থেকে সরাসরি চাকরি করতে এসেছে! 7 Habits Course টা প্রত্যেককে ভালভাবে করানো উচিত। বাংলাদেশের আমুল পরিবরতন দরকার।
     
  • সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা

    সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা

    ..........মশার কামড় খেতে হতো...এটা আমাদের দেশ সম্পর্কে ভালো পরিচয় নয়।’ বোঝা যাচ্ছে, আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর, এমনকি এর মশাও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল না হয় হবে, কিন্তু বিমানবন্দর বদলানোর কী হবে? এর মশাই-বা তাড়াবে কে?........ আমি দেশে গিয়ে বিমান বন্ধরে দেখেছি এই অসনীয় মশার উপদ্রপ। জানিনা সরকারের কোনো সংস্থা এই মশা নিধনের ব্যপারে কোনো চিন্তা করছেন কিনা কিংবা তারা আদৌ এই মশার উপস্থিতি সম্পর্কে জানেন কিনা। সরকার কি সত্যিকার অর্থেই এই মশার বিরুদ্ধ যুদ্দ্ব করতে অক্ষম? অক্ষম হলে বিদেশী শক্তিকে আহ্বাং করতে পারে এবং তাতে সাড়াও মিলবে, জনগনেরও কোনো আপত্তি থাকবে না। প্রয়োজনে ৩য় বিশ্বযুদ্ধের আহ্বানও করতে পারেন মশার বিরুদ্ধে।
     
  • hidden

    যে দেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মানুষ মরলে কোনো জবাবদিহিতায় পড়তে হয়না, সেদেশের বিমান বন্দরের মশা নিয়া জবাবদিহিতায় পড়তে হবে! তবে কর্তৃপক্ষ একটি কাজ করতে পারেন, যখনই কোনো বিদেশি আসবে তাকে একটি করে মশার কয়েল দিয়ে, অপেক্ষা করতে বলতে পারেন।তাতে ভদ্রলোক মাথায় বিনিয়োগ চিন্তা নিয়ে দু’ঘন্টা আরামে ঘুমিয়ে নিতে পারবেন।ওনারাও দু’ঘন্টার মধ্যে ওনার কাগজপত্র এবং তার কাজ সম্পন্ন করে দিতে পারবেন।
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন