মতামত     সংবাদ

জিপিএ-৫, নাকি পরিপূর্ণ মানুষ

প্রতীক বর্ধন | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১১:১৪

ছেলেবেলায় ১৯৮০-এর দশকে পাড়া-মহল্লায় দেখতাম, এক দঙ্গল ডানপিটে ছেলে একত্রে ঘোরাফেরা করত। এরা নানা রকম সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিল। পাড়ার হেন কাজ নেই, যেখানে তাদের দেখা পাওয়া যেত না। আবার তাদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াত। আজকের উত্তরার গ্যাং সংস্কৃতির সঙ্গে ওই আমলের গ্যাং বা দলের পার্থক্য এখানেই যে আজকের এই গ্যাং কিশোরেরা সমাজের ভালো কাজ থেকে দূরে থাকে। সহিংসতা ও মস্তানির দিকে ঝোঁক। যার বলি তাদেরই বন্ধু আদনান কবির।
এই কিশোরেরা এতটাই বেপরোয়া যে, ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে তারা খুন করতে যায়। অভিভাবক, স্কুল কর্তৃপক্ষ—সবাই যেন তাদের কাছে অসহায়। এ অবস্থায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ঘোষণা দিয়েছে, উত্তরায় স্কুলের পোশাক পরে কিশোরেরা ঘোরাঘুরি করলে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছেই কেবল তাদের হস্তান্তর করা হবে। এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার এই সুযোগে পুলিশও যে হয়রানি করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? কারণ, পুলিশের বিরুদ্ধে তো অভিযোগের শেষ নেই। তখন আবার প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেতে পারে!
এই সমস্যা সমাধানে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই শ্রেয়, যদিও তার সঙ্গে কিছু সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ারও অবকাশ রয়েছে। স্থায়ী পদক্ষেপের প্রসঙ্গে বলা যায়, স্কুলগুলোতে পাঠাতিরিক্ত কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে, যেগুলো একসময় থাকলেও এখন নেই বললেই চলে। ক্লাসের পর ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ নানা রকম সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা যায়। তবে সবাই যে এসব করবে তা নয়, তাদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা করা যায়। আজকের ঢাকা নগরের অভিভাবকেরা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এতে স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি ছাত্রদের এসব কাজে নিয়োজিত রাখতে পারে, তাহলে তাঁরাও একটু স্বস্তি পাবেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা যেভাবে জিপি-৫-এর পেছনে ছুটছি, তাতে অভিভাবকদের অনেকেই এই ব্যবস্থায় রাজি হবেন কি না, সন্দেহ! কিন্তু তাঁদেরও ভেবে দেখা উচিত, এই ইঁদুরদৌড় থেকে আমরা কী অর্জন করছি। তবে এখানে সরকারের ভূমিকাই প্রধান। কারণ, সরকার না চাইলে তো স্কুলের পক্ষে এককভাবে এটা করা সম্ভব নয়। এর জন্য অনেক আয়োজনের ব্যাপার আছে। অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে।
ভয় দেখিয়ে উত্তরার এই কিশোরদের সাময়িকভাবে হয়তো নিবৃত্ত করা যাবে, কিন্তু ওদের তৎপরতা একেবারে বন্ধ করা যাবে না। সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন না এলে বা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার না করলে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের উচিত, সন্তানদের সময় দেওয়া, শুধু টাকা দিলেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মানুষের সামাজিকায়ন বা শিক্ষার প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিবার। তাই এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর চলে আসে স্কুলের কথা। জিপিএ-৫ পাওয়ার বিদ্যার সঙ্গে যদি শিশু-কিশোরেরা সামাজিকতা, নৈতিকতা, বিবেকের শিক্ষা না পায়, তাহলে হয়তো আরও অনেক আদনানের মৃত্যু আমাদের দেখতে হবে। একই সঙ্গে স্কুলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও থাকা উচিত, কারণ কিশোর বয়সে মানুষের চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করে, যেটা তাকে এলোমেলো করে দেয়।
কথা হচ্ছে, আদনানের খুনি কিশোরদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জিপি-৫ পেত, কিন্তু এই জিপিএ-৫ লইয়া আমরা কী করিব! ফলে আমরা কি জিপিএ-৫
উৎপাদন করব, নাকি পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই!

পাঠকের মন্তব্য (৯)

  • Mahfuz Rupon

    Mahfuz Rupon

    দেশের কোম্পানি গুলুর উচিত সাটিফিকেট এর জি পি এ ৫ না দেখে তাদের ভিতরের শিক্ষাকে যাচাই করে নিয়োগ দেয়া তাহলে কোম্পানি গুলু উন্নতি করতে পারবে আর দেশের ও উন্নতি হবে।
     
  • বিপুল

    বিপুল

    আধো আধো বোলে কথা শেখার আগেই 'ভাল' স্কুলে ভর্তির লড়াই শুরু হয়ে যায়। সাথে শুরু হয় সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়ে ফার্স্ট হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এই স্বার্থপর লড়াইয়ের কারনেই এসব কোমলমতি শিশু কিশোররা হয়ে উঠছে নির্দয়। তাছাড়া মাঠের খেলার চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যান, জিটিএ ভাইস সিটি জাতীয় খুনাখুনি রক্তারক্তি গেমসগুলোও তাদের করে তুলছে এমন আগ্রাসি।
     
  • hidden

    আদনান কবির এর বাবা কি তার চলাফেরা,আচরন খেয়াল করেনি?কিছু অভিভাবক তাদের সন্তানদের অযাচিত আব্দার পূরন করে তাদের অমঙ্গল করছেন সেই সাথে সমাজ ও দেশের।১৫ বছরের কিশোর কীভাবে মোটর সাইকেল চালায়?প্রাথমিক স্তর শেষ না হতেই বাচ্চারা কীভাবে ফেইসবুক এর সদস্য হয়,মোবাইল ফোন এর মালিক হয়?
     
  • ABDUL MAJID QUAZI

    ABDUL MAJID QUAZI

    প্রবন্ধটি পড়ে কিছু প্রস্তাব করার অবকাশ আছে। লেখক লিখেছেন জিপিএ ৫পাবার জন্য ছেলেমেয়েরা স্কুলের পর ইদুর দৌড় দৌড়ায়। যারা দৌড়ায় তাদের হাতে দলাদলি করার সময় থাকে না। তারা খুনাখুনি করে না। যাদের ছেলেরা প্রাইভেট পড়ার নামে ঘরের বাহিরে গিয়ে টিঊটারের কাছে না গিয়ে আড্ডা ও দলাদলি করে সেই সব মাবাপ সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। প্রত্যেকের উচিত/দায়িত্ব খোজ রাখা তার সন্তান স্কুল ও টিউটারের কাছে নিয়মিত যায় কি না। এক্ষেত্রে স্কুল ও টিউটার সহায়তা করতে পারেন। ছেলের অনুপস্থিতি মাবাপকে ফোনে জানিয়ে। পুলিশরাও পিতা। তাদের প্রস্তাবিত পদ্ধতি মন্দ নয়। সামান্যতম উপকার হলেও পরীক্ষা মুলক ভাবে তা প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পুলিসকে আদর্শ পিতার মত আচরণ করতে হবে — পুলিশ হিসাবে নয়। উন্নত বিশ্বে প্রথম সন্তান সম্ভবা মাবাপ তিন মাসের পেরেন্টিং কোর্স করে থাকে যারা প্রয়োজন মনে করে । আমাদের বর্তমান জমানার পিতা মাতারা সন্তান লালন পালনের সেরকম শিক্ষা নিতে পারেন। সরকার সেরকম ট্রেনিং কোর্স চালু বা পুস্তিকা ছাপাতে পারে অভিজ্ঞ লোকের মাধ্যমে কমিটি করে যাচাই বাচাই করে। লেখক স্কুলের ক্লাসের পর যে ব্যবস্তার প্রস্তাব করেছেন তা অসম্ভব। শিক্ষকদের ঘরেও সন্তান আছে। নির্দিষ্ট সময়ের পর ঘরে গিয়ে নিজের সন্তানের দেখাশোনা তাদের দায়িত্ব ।
     
  • hidden

    এই ধরনের কিশোর গ্যাং তৈরিতে বাবা-মায়ের অবদান অনেক বেশী, যদিও তার খারাপ প্রভাবটা সবচেয়ে বেশী পরে তাদের উপরেই। কিশোর বয়সী ছেলেরা কোনভাবেই মটরবাইক পেতে পারে না। অথচ শুধু ঢাকা নয়, গ্রাম গঞ্জেও এখন উঠতি বয়সী ছেলেরা বাইক নিয়ে অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এই দায়বার এড়াতে পারে না, তাদের যোগসোগের কারনে কিশোরগ্যাং গুলো অপরাদের সুযোগ অনে বেশী পাচ্ছে। একটি সুস্থ-সুন্দর আগামী প্রজন্ম পেতে এব্যাপারে সচেতনতা তৈরি এখন সময়ের দাবী। পুলিশের এগিয়ে আসাকে অবশ্যই পজিটিভ-ভাবে দেখা উচিৎ, সাধারনভাবে এধরনের সামাজিক অবক্ষয়ের বিপরীতে তাদের অবস্থান খুব একটা পাওয়া যায় না। এতে করে অল্প কিছু ভালো ছেলে হেনস্তা হওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক মিডিয়াম মানের খারাপ ছেলেরা ঐপথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হবে।
     
  • S. M. Abdul Haque

    S. M. Abdul Haque

    পরিপূর্ণ মানুষই আমাদের কাম্য।
     
  • tushar

    tushar

    যারা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য দায়ী, তারাই এই কিশোর অপরাধীদের উত্থানের জন্য দায়ী।
     
  • Abdul Hannan Paul

    Abdul Hannan Paul

    ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নাই । ধর্মীয় শিক্ষা থাকলে এ অবস্থা হতো না ।
     
    • hidden

      সব জায়গায় অযথা ধর্ম না টেনে সমস্যার মূলে যান।
       
মন্তব্য করতে লগইন করুন