মতামত     সংবাদ

ধর্ম

মাতৃভাষা আল্লাহর দান

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০৭  

.ভাষা আল্লাহর দান, আল্লাহ তায়ালার সেরা নেয়ামত। মাতৃভাষা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম। ভাষা মনুষ্যপরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রাণিকুল, পশুসমাজ থেকে স্বাতন্ত্র্যের মোক্ষ উপাদান হলো ভাষা। মাতৃভাষা মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলাম সব ভাষাকে সম্মান করতে শেখায়। কারণ, সব ভাষাই আল্লাহর দান ও তাঁর কুদরতের নিদর্শন। কোরআন করিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ২২, ২১, পারা: ২১, পৃষ্ঠা: ৫-৪০৭)।
আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘আশরাফুল মখলুকাত’ হলো মানুষ। মানুষ ভাষা দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। মানুষের পরিচয় বা সংজ্ঞায় আরবিতে বলা হয়, ‘হায়ওয়ানুন নাতিক’, অর্থাৎ ‘বাক্‌শক্তিসম্পন্ন প্রাণী’।
ভাষা বা বর্ণে নয়, কর্মেই পরিচয়
সব মানুষ একই পিতা-মাতার সন্তান। সবারই পিতা বাবা আদম আলাইহিস সালাম, সবারই মাতা মা হাওয়া আলাইহাস সালাম। সাদা-কালো, লম্বা-খাটো—সে তো আল্লাহর সৃষ্টি। বর্ণবৈষম্য, ভাষাবৈষম্য এবং ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক পার্থক্য মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। কোরআনে করিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন। (সুরা-৪৯ হুজুরাত, আয়াত: ১৩, পারা: ২৬, পৃষ্ঠা: ১৬-৫১৮)।

সব নবী-রাসুল স্বজাতির ভাষাভাষী ছিলেন

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: ‘তিন কারণে তোমরা আরবিকে ভালোবাসো; যেহেতু আমি আরবি, কোরআন আরবি এবং জান্নাতের ভাষাও হবে আরবি।’ (বুখারি)। সর্বশেষ আসমানি কিতাব ফুরকান বা কোরআন আরবি ভাষায় সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাজিল করা হয়েছে।

বিদায় হজের ভাষণে নবী করিম (সা.) বলেছেন: ‘কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (বুখারি শরিফ)। সুতরাং কোনো ভাষাকে হেয়জ্ঞান করার অবকাশ নেই, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সুযোগ নেই ও অবহেলা করার অধিকার নেই। কেননা, ভাষার স্রষ্টা মহান আল্লাহ। তাঁর সৃষ্টির অবমূল্যায়ন করা তাঁর প্রতি অসম্মান প্রদর্শনেরই নামান্তর। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাঁদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সুরা-১৪ ইবরাহিম, আয়াত: ৪, পারা: ১৩, পৃষ্ঠা: ১৪-২৫৬)।

মহাগ্রন্থ আল কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল করার কারণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে: ‘আমি অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কোরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২, পারা: ১২, পৃষ্ঠা: ১৪-২৩৬)। আরবদের কাছে আরবি কিতাব আল কোরআন নাজিল করা হয়েছে। কারণ, তাদের মাতৃভাষা আরবি; অন্য ভাষায় নাজিল করলে তাদের বুঝতে এবং অনুসরণ করতে অসুবিধা হতো।

ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সুন্নত

শুদ্ধ ভাষা ও সুন্দর বর্ণনার প্রভাব অনস্বীকার্য। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) ছিলেন ‘আফছাহুল আরব’ তথা আরবের শ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধ ভাষী। সুতরাং বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় কথা বলা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। কোরআনুল করিমের বর্ণনা: ‘দয়াময় রহমান আল্লাহ! কোরআন পাঠ শেখালেন; মনুষ্য সৃজন করলেন; তাকে ভাষা বয়ান শিক্ষা দিলেন।’ (সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ১-৪, পারা: ২৭, পৃষ্ঠা: ১০-৫৩২)।

ভাষাচর্চা ইবাদত। আরবি ভাষার ব্যাকরণ মুসলমানদের হাতেই রচিত হয়। অনারবদের কোরআন পড়তে সমস্যা হতো বিধায় হজরত আলী (রা.) তাঁর প্রিয় শাগরেদ হজরত আবুল আসওয়াদ দুওয়াইলি (রা.)-কে নির্দেশনা দিয়ে আরবি ভাষাশাস্ত্র প্রণয়ন করান, যা ইলমে নাহু ও ইলমে ছরফ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে উচ্চতর ভাষাতত্ত্ব ইলমে বায়ান, ইলমে মাআনি ও ইলমে বাদির উন্নয়ন ঘটে; যার পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম আবদুল কাহির জুরজানি (রা.) ও ইমাম জামাখশারি (রা.)।

শেখ আবদুর রহমান জামি (রা.) পারস্যবাসী হয়েও বিশ্বের সেরা আরবি ব্যাকরণের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গ্রন্থ শারহে জামি (ফাওয়ায়িদে জিয়াইয়া) রচনা করেন, যা শাফিয়া গ্রন্থের প্রণেতা ইমাম ইবনে হাজিব (রা.) প্রণীত কাফিয়া গ্রন্থের ব্যাখ্যা। এ গ্রন্থের আরও জগদ্বিখ্যাত বিশেষণ পুস্তক রয়েছে; সুওয়ালে কাবুলি, সুওয়ালে বাসুলি, তাহরিরে চম্বট ইত্যাদি এর অন্যতম।

সাহিত্যচর্চাও ইবাদত

সুসাহিত্য রচনাও ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘হে নবী (সা.), আমি আপনার প্রতি সর্ব সুন্দর কাহিনি বর্ণনা করেছি।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২, পারা: ১২, পৃষ্ঠা: ১৪-২৩৬)। প্রিয় নবী (সা.) নিজে কাব্য করতেন। বিখ্যাত সাহাবি হজরত হাসসান বিন সাবিত (রা.) কাব্য রচনা করতেন। হজরত আয়িশা (রা.) কাব্যচর্চা করতেন। এভাবে ইসলামের সব যুগেই বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যচর্চা চলে আসছে।

সত্য প্রচার ও দাওয়াতি কাজে ভাষার প্রভাব

আল্লাহ তায়ালা মানুষের হিদায়াতের জন্য নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন। সব নবী-রাসুলের ধর্ম প্রচারের প্রধান মাধ্যম ছিল দাওয়াত তথা মহা সত্যের প্রতি আহ্বান। আর এর জন্য ভাষার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি অহি নাজিল করলেন; তাঁকে নবী ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করলেন; তাঁর প্রতি তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ করেন, তখন তিনি তাঁর ভাই হজরত হারুন (আ.)-কে নবী ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আল্লাহর সমীপে আরজ করলেন। কারণ, তিনি ছিলেন বাগ্মী, শুদ্ধ ও স্পষ্টভাষী সুবক্তা, আর মুসা (আ.)-এর মুখে ছিল জড়তা।

মুসা (আ.) কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘সে আমা অপেক্ষা বাক্‌পটু’। কোরআন করিমে এই বর্ণনাটি এভাবে উপস্থাপিত হয়েছে: মুসা (আ.) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সিনা প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার ভাষার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। আমার জন্য একজন সাহায্যকারী বানিয়ে দিন আমার স্বজনদের মধ্য থেকে; আমার ভাই হারুনকে; তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাকে আমার (দাওয়াতি-প্রচার) কাজের শরিকদার করুন, যাতে আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা বেশি বেশি বর্ণনা করতে পারি এবং আপনাকে অধিক স্মরণ করতে পারি; আপনি তো আমাদের সর্বতো প্রত্যক্ষকারী।’ (সুরা-২০ তহা, আয়াত: ২৫-৩৬, পারা: ১৬, পৃষ্ঠা: ১২-৩১৪)।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

smusmangonee@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন