মতামত     সংবাদ

যৌন নির্যাতন

নীরব থাকার সংস্কৃতি ঝেড়ে ফেলতে হবে

রোকেয়া রহমান | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০৬  

.দেশের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার! গত সোমবার সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে ভয়াবহ এই তথ্যটি জানিয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। যদিও শিশু বা কিশোরীদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবর নতুন কিছু নয়, তারপরও তাদের ওপর যৌন নির্যাতনের এই হার দেখে উদ্বিগ্ন না হয়ে থাকা যায় না। যেহেতু প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য, তার মানে সরকারি হিসাব। তাহলে ধরে নিতে পারি প্রকৃত হার এর চেয়ে অনেক বেশি। সেটা কত জানা নেই।
তবে সরকারের দেওয়া তথ্য যদি সঠিক হয়, সেটাই-বা কম কী? একটি দেশের ৩৪ শতাংশ কিশোরী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এর চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আর কী হতে পারে। যে বয়সটা শুধু খেলাধুলা আর পড়াশোনা করার, যে বয়সটা জীবনের কঠিন বাস্তবতা বোঝার নয়, সেই বয়সেই কিনা এই কিশোরীরা সবচেয়ে জঘন্যতম ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। এটা তো ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের হিসাব।
যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এর চেয়েও কম বয়সী শিশুরা। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি পরিসংখ্যানে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭২৪টি। এর মধ্যে ৩০৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫৭ জন শিশুর বয়স ১২ বছরের কম। ৬ বছরের নিচে আছে ৪৬টি শিশু। আসকের তথ্যমতে, গত এক বছরে ১৬ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয় ৪ শিশুকে। হত্যার শিকার ১০টি শিশুর বয়সই ১২ বছরের কম।
শিশুবিষয়ক বেসরকারি সংস্থাগুলোর জাতীয় নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যমতে, ২০১৬ সালের প্রথম ১১ মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে চার শতাধিক, যার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৪টি শিশু। ধর্ষণের শিকার বেশির ভাগ শিশুর বয়স ৪ থেকে ৯।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টি সেক্টরাল প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত সাত বিভাগে সাতটি এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৮৬টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই ধর্ষণের শিকার।
এসব তথ্য পড়ে পাঠকেরা কি শিউরে উঠছেন না? এসব হিসাব তো পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে পাওয়া। এর বাইরে কত শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তার কোনো হিসাব নেই। ৮ মাসের শিশুও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ধর্ষিত হচ্ছে প্রতিবন্ধী শিশুরাও
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন (বিপিএফ) এবং সেভ দ্য চিলড্রেন সুইডেন-ডেনমার্ক যৌথভাবে একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেছে, বাংলাদেশে শারীরিক ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জে থাকা অর্ধেকের বেশি শিশু যৌন হয়রানির শিকার। এবং সেটি তারা হচ্ছে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের দ্বারাই।
এই স্বজনেরাই এখন শিশুদের জন্য ভয়ের কারণ। চাচা, মামা, খালু, ফুফা। চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, খালাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, বোনের স্বামীরাও রয়েছে এই তালিকায়। পাশের বাড়ির বৃদ্ধ দাদু ও গৃহশিক্ষকও বাদ যান না।
গাজীপুরে একজন মা তাঁর কোলের ছোট মেয়েটিকে বয়স্ক পুরুষ আত্মীয়ের কাছে রেখে বাইরে যান। আর এই সুযোগে সে আত্মীয় শিশুটিকে যৌন হয়রানি করেছেন। কিশোরী মেয়ে বান্ধবীর বাড়ি যাবে। একা যাবে কী করে। সঙ্গে পাঠানো হলো প্রাপ্তবয়স্ক মামাতো ভাইকে। পথে মামাতো ভাই কিশোরীকে ধর্ষণ করল। গত বছর রাজধানীর মিরপুরে এ ঘটনা ঘটেছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের সেই পাঁচ বছরের শিশুর কথা নিশ্চয়ই এখনো কেউ ভুলে যাননি। চল্লিশোর্ধ্ব দুই ব্যক্তি ওই শিশুটিকে ধর্ষণ করে।
এ কেমন দেশে আমরা বাস করি, যেখানে শিশুদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা নেই। শিশুরাও পুরুষের ভোগের সামগ্রী! এ দেশে শিশুরা থাকবে কী করে? শিশুদের নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা নেই। তাদের সঙ্গে এমন আচরণ? যে শিশুরা যৌনতা শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নয়। পরিচিত নয় ধর্ষণ শব্দটির সঙ্গে, তারাই কিনা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে! হচ্ছে ধর্ষিত!
যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শিকার শিশুরা পরে আর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় তারা ভুগতে থাকে।
কাজেই সময় নষ্ট করার আর কোনো সুযোগ নেই। শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নকারীদের ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার সময় হয়েছে। বিষয়টিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। দেখা গেছে, শিশু বা কিশোরীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটলেও বদনামের ভয়ে কেউ মামলা করেন না বা ঘটনাটি কাউকে জানান না। অনেক কিশোরীও যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। এই সুযোগে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। নীরব থাকার এই সংস্কৃতি ঝেড়ে ফেলতে হবে। এ ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। তা না হলে ঘটতেই থাকবে শিশু-কিশোরীদের ওপর যৌন নির্যাতন।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন