উত্তর আমেরিকা     সংবাদ

নতুন প্রজন্মের অনেকে প্রকৃত ইতিহাস জানে না

খুরশীদ শাম্মী, টরন্টো, কানাডা | ২০ মার্চ ২০১৭, ১৬:২৪

বিশ্বের অন্য প্রান্তে বসেও গর্ব করি বাংলাদেশ নিয়ে। আমার মতো লাখ লাখ প্রবাসী মনের মধ্যে লালন করে একটি করে বাংলাদেশ। আর করবেই না বা কেন? কী নেই সেখানে? সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের বাংলাদেশ। তার ভূমি, নদী, আকাশ, বাতাসে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক নিখাদ মায়া। প্রাণের বাংলা ও বাংলাদেশ নামে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়াবার কঠিন ইতিহাস। আছে শহীদদের রক্তে ভেজা লাল সবুজ পতাকা ও তাঁদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত মাথা উঁচু করে বাঁচবার শক্তি স্বাধীনতা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর হয়েছে। আগামী ২৬ মার্চ ৪৭ বছরে পদার্পণ করবে আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। এই ৪৭ বছরে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই মারা গেছেন। আর যারা বেঁচে আছেন, তাঁদের অধিকাংশই বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাঁদের চেতনা, তাঁদের মনোবল, সাহস, দেশপ্রেম রয়ে গেছে বাংলার ইতিহাসের পাতায় পাতায়। এরপরও, যত দিন যাচ্ছে কেন যেন মনে হয়, আমাদের দেশের নবীনদের প্রকৃত ইতিহাস জানার পদ্ধতিতে কোনো ত্রুটি আছে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের বর্তমান নতুন প্রজন্মের অনেকে দেশের স্বাধীনতা ও মাতৃভাষা রক্ষায় ভাষা দিবসের প্রকৃত ইতিহাস জানে না। আবার অনেকেই দুটো বিষয়কে গুলিয়ে পেঁচিয়ে এক করে জানে। এর বড় উদাহরণ ছিল, এ বছর ভাষা দিবসে টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিকদের ধারণকৃত বইমেলায় উপস্থিত কিশোর-কিশোরীদের সাক্ষাৎকার। কিশোর-কিশোরীদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আজ কী দিবস?, এই দিনে কী হয়েছিল? ইত্যাদি। সেসব প্রশ্নের উত্তরে কিশোর-কিশোরীরা যা বলল, তা নিয়ে অনেকেই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মাত্র ৪৭ বছরে দেশের নতুন প্রজন্ম যে দেশ ও ভাষার সঠিক ইতিহাস জানতে ব্যর্থ হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে? নতুন প্রজন্ম নিজে না তার পরিবার? না দেশের শিক্ষাব্যবস্থা?
এ ক্ষেত্রে দায়ভার যতটুকুই না তার নিজের ও তার পরিবারের ওপর, তার থেকেও অধিক দায় কিন্তু পাঠ্যপুস্তক নির্বাহী কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সমাজেরই। পরিবারগুলো হয়তো বিভিন্ন কারণে সঠিক ইতিহাস শিশুদের কাছে তুলে ধরতে ব্যর্থ হতে পারে, তবে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার সঠিক ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকগুলোর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়া সত্ত্বেও তারা সঠিক ইতিহাস জানে না। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুত্বপূর্ণ দিবসকে ঘিরে শিক্ষামূলক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। প্রতিটি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাতে ভাষা দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের মতো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো বাধ্যতামূলকভাবে পালিত হতে পারে।
শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি আমরা বয়স্করাও শুভঙ্করের ফাঁকফোকর দিয়ে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল করে যাচ্ছি দেশের প্রকৃত ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও পতাকাকে উত্থাপন করতে। এর একটি বড় উদাহরণ, স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা করা সম্ভব হয়নি; কারণ কিছু লোভী ও ভণ্ড নাগরিকদের মুক্তিযুদ্ধ না করেও বয়সের হিসাবে ফেলে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা জাহির করার জন্য নানান মিথ্যা গল্পের আশ্রয় নেওয়া। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা করা সম্ভব হয়নি বললে হয়তো ভুল হবে। আসলে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই হয়তো এই বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কিছু করতে চাচ্ছে না। কারণ একটি স্বাধীন দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল বিষয়। আর ক্ষমতা লোভীরা এই বিষয়টি তাদের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করে থাকে। সে ক্ষেত্রে তারা অর্থ ও প্রতিপত্তির দাপটে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে দেশপ্রেমিকের মুখোশ পড়ে ক্ষমতা আদায় করে নেয়।
বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে সব থেকে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই নিজের ভাব, ভালোবাসা, ভালোলাগা-মন্দ লাগা, এমনকি দেশ, জাতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর বিজয় দিবসে অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে উড়িয়েছিল বাংলাদেশের পতাকা। সেখানেও সাধারণ জনগণ স্বার্থলোভীদের কুচক্রের শিকার হয়। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার পণ্যের স্লোগান বসিয়ে দিয়েছিল লাল সবুজ পতাকার প্রোফাইল ব্যানারের লাল বৃত্তে। আবার আরেক দল দাঁড়িপাল্লার একটি পাল্লা ঢুকিয়ে দিয়েছিল পতাকার লাল বৃত্তে। এ কেমন দেশাত্মবোধ?
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এটা আসলে নবীনদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানাবার কলকাঠি। এভাবেই অতি বুদ্ধিমান স্বার্থপরেরা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সরলতা। মিথ্যা আবরণে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে তাদের দেশপ্রেম। আর সাধারণ মানুষ বারবার চালাক মানুষদের কাছে বোকা বনে যায়।
গত ৪৬ বছরে যেমন আমরা হারিয়েছি বহু মুক্তিযোদ্ধাদের। ঠিক তেমনি হারিয়েছি অনেক না-বলা সাহসী সত্যি ঘটনাকে। না-বলা সত্যি ঘটনা যা ৪৬ বছরে হারিয়ে গেছে, তা হয়তো সঠিক করে আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে না কখনো। তবে যেসব কঠিন, সত্য ঘটনা আমাদের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেপ্টে আছে, দয়া করে যদি নিজেদের স্বার্থে আর কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা সংকুচিত না করে কালের ব্যবধানে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তবে হয়তো দেশ আরও বহুদিন তার সঠিক ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। নতুবা ওই সব স্বার্থপরেরা সঠিক ইতিহাস না-জানা নাগরিকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একদিন পণ্যের মতো দেশকেও বেঁচে দেওয়ার চেষ্টা করবে। যদিও তা বাস্তবে করা সম্ভব হবে না। কারণ দেশপ্রেমিকেরা তত দিনে ঠিকই তাদের মুখোশের আড়ালের সত্যিকার চেহারা খুঁজে পাবে। এর বড় উদাহরণ, কয়েক দিন ধরে চোখে পড়ছে Zazzle নামের এক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা ও মানচিত্র ব্যবহার করে জুতা বিক্রি করছিল। কিন্তু বাংলাদেশিদের প্রতিবাদে বাংলাদেশের পতাকা ও মানচিত্রে অঙ্কিত তাদের পণ্য ওয়েবসাইট থেকে তুলে নিয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশি দেশপ্রেমিকেরা সময়ের প্রয়োজনে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে বারবার।
সময়ের ভাঁজে একদিন এক এক করে প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকেই চলে যেতে হবে। কিন্তু থেকে যাবে ইতিহাস। তাই দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রশাসনিক বিভাগগুলোর প্রতি অনুরোধ যেন প্রকৃত ইতিহাসকে কোনো প্রকার নিজেদের স্বার্থে পরিবর্তন করা না হয়। প্রকৃত ইতিহাস যেন স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক পদ্ধতিতে পৌঁছে যেতে পারে। কারণ তাদেরও একদিন সময়ের প্রয়োজনে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হতে পারে।
চলছে স্বাধীনতার মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ মাস একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় মাস। স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ মাস থেকেই না-হয় আমরা প্রতিটি বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিশ্বাস, দল ও ধর্ম নির্বিশেষে দেশকে ভালোবাসার চর্চা করি। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আমরা ভণ্ড, স্বার্থপরদের দ্বারা প্রতারিত না হই। আমাদের সব প্রজন্মের নাগরিকদের দেশাত্মবোধ থাকুক জাগ্রত; রাজনীতির বেড়াজাল থেকে মুক্ত। প্রয়োজনে থাকুক লোক চোখের অন্তরালে। তবু অন্তরে থাকুক দেশাত্মবোধ।

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন