উত্তর আমেরিকা     সংবাদ

সজাগ হও, হে তারুণ্য!

রউফুল আলম, পেনসিলভানিয়া (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে | ১৮ মার্চ ২০১৭, ১৯:৪৫

আমার রিসার্চ গ্রুপে চীন থেকে একটি ছেলে এসেছে। তার নাম জিপেং লু। বয়স ২২ বছর। ছেলেটা পড়ে সিচুয়ান ইউনিভার্সিটিতে। চীনের খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটি সেটি। সে এসেছে আন্ডারগ্রেড রিসার্চ করতে। ছয় মাস কাজ করবে। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার মতো একটি সেরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তার ভাবনার জগৎটাই পরিবর্তন হয়ে যাবে। এখান থেকে ফিরে গিয়ে আগামী জুনের মধ্যে সে স্নাতক ডিগ্রি পাবে। তার লক্ষ্য, আমেরিকায় গ্র্যাজুয়েট স্টাডি করা। এখানে আসার আগেই সব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। আগামী সেশনের জন্য সে আমেরিকার ১০টা স্কুলে আবেদন করেছিল। এর মধ্যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির ডাক পেয়েছে।
এই ছেলেটি যখন পিএইচডি শেষ করবে তখন তার বয়স হবে ২৬ কী ২৭ বছর। তার সামনে পড়ে থাকবে একটি সম্ভাবনাময়ী জীবন। সে তার যুগকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। তার দূরদর্শিতা ও আগাম পরিকল্পনা আমাকে বিস্মিত করেছে। ২২ বছরের একটি তরুণের যে পরিপক্বতা ও বোধগম্যতা, তাতে অভিভূত না হয়ে উপায় নেই। তার সঙ্গে আলোচনায় বুঝতে পারলাম, চীন দেশের ছেলে-মেয়েরা সবাই এমন দূরদর্শী। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সব প্রস্তুতি তারা শুরু করে ইউনিভার্সিটির শুরু থেকেই। তাদের বয়স তখন ১৮ কী ১৯। তার কথা মতে, চাইনিজরা পরীক্ষায় খুব ভালো স্কোর তুলতে পারে। আমেরিকান ছেলে-মেয়েরা যেখানে ৬০-৭০ ভাগ স্কোর পায়, তারা পায় ৯০ থেকে ৯৫। তাই ইউরোপ-আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য যেসব টেস্ট প্রয়োজন হয়, সেগুলোতে তারা ভালো স্কোর তুলতে পারে।
আমাদের দেশের অসংখ্য ছেলে-মেয়ে ২০-২২ বছর বয়সে গবেষণার কথাই জানে না। তাদের বলাও হয় না। বোঝানো হয় না। অনেকে জানেই না, সারা দুনিয়ায় তরুণেরা পঁচিশ-ছাব্বিশের মধ্যে পিএইচডি শেষ করে। সে বয়সে দেশের বহু শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করতে পারে না। সেশনজট নামক এক জঘন্য বিষয় জীবনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়।
তরুণদের বলছি, বর্তমান পৃথিবীর প্রতিযোগিতাটা আন্তর্জাতিক। প্রস্তুতিটা তাই খুবই কঠিন। দেশের সীমানা পেরিয়ে বের হলেই বুঝবে, কত কত জাঁদরেল ছেলেমেয়ে ঝাঁকে-ঝাঁকে সারা পৃথিবী থেকে জড়ো হয়। সেখানে টিকে থাকাটা অনেক বড় পরীক্ষা। ইউরোপ-আমেরিকার যে জায়গাটার জন্য তুমি লড়ছ, সেটার জন্য শুধু চীন দেশের ১০টি স্টুডেন্ট ও ভারতের ৮জন লড়ছে। কারণ তারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে যথাক্রমে ১০ গুণ ও ৮ গুণ বেশি। তাদের সঙ্গে আমাদের কিন্তু লড়তেই হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অর্থের জোর নেই। রাজনৈতিক নেতার সুপারিশ নেই। কোটার সুবিধা নেই। শুধু মেধার জোরেই টিকে থাকতে হয়।
যে ছেলেমেয়েগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত তাদের বোধোদয় দরকার। তুচ্ছ মানুষের পেছনে স্লোগান দিয়ে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় নষ্ট না করে নিজের স্বপ্ন তাড়া করা অনেক উত্তম। শ্রেষ্ঠতম কাজ! দলবাজি, চাঁদাবাজি আর নেতার পদলেহনের রাজনীতি, মাদকাসক্তি এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে জীবন নিয়ে প্রত্যয়ী হও। ইন্দ্রজিৎ হওয়ার সপনে বিভোর থাক।
স্রোতের বাধা ঠেলে মাছ উজানের দিকেই যায়। ছুটে চলে সামনে। মানুষের জীবনেও বাধা চিরন্তন। রাষ্ট্রের শত ভাঙনের কালেও তোমার থেমে থাকা চলবে না। সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে জীবনের সময়টুকু পার হবে না। মানুষ শুধু বিজয়ীর কথা শুনতে চায়। তোমার কী নেই সেটা শুনতে কেউ বসে নেই। যা নেই, তা নেই। যা আছে, তাই দিয়েই করো সংগ্রাম। পৃথিবীর প্রতিযোগিতায় লড়াইয়ের জন্য অবতীর্ণ হতেই হবে। যুদ্ধে জয়ী হতে হলে প্রস্তুতিটা হতে হয় কঠিন। সুতরাং সজাগ হতে হবে সঠিক সময়েই।
ড. রউফুল আলম: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া যুক্তরাষ্ট্র।
ই-মেইল: rauful.alam15@gmail.com ; ফেইসবুক: www.facebook.com/rauful15

পাঠকের মন্তব্য (৩)

  • Anwar Huq

    Anwar Huq

    Chinese, Korean বা Japanese তরুন তরুনিরা দুরদরশিতার শিক্ষা পেয়েছে তাদের বাবা মার কারনে। আমাদের মা বাবারা সারা দিন হিন্দি সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত কাজেই আমাদের তরুন প্রজন্ম ওদের মত শেয়ানা না।
     
    • hidden

      হুম। এখন সব দোষ হিন্দি সিরিয়ালের।
       
  • Mag hannan

    Mag hannan

    অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি ছাত্রদের কে একটু আশার বাণী শোনান তাহলে ভাল হত।অধিকাংশ শিক্ষক যেখানে নিয়োগ লাভ করেন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে তার ক্লাশে না পড়ালেও পারে। আদতে কতটুকু পড়ান। সেশন জট হলে তাদের কি?
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন