জীবনযাপন     সংবাদ

তারুণ্যে বাংলাদেশ

নাদিয়া মাহমুদ | ২১ মার্চ ২০১৭, ০০:০৯  

তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখা যায় বছরজুড়েই। মডেল: সুমন ও শ্রাবণ্য, পোশাক: নিত্য উপহার, সাজ: রেড বিউটি স্যালন, ছবি: সুমন ইউসুফকিছুদিন আগে একটি মেলায় গিয়েছিলাম। ব্যাগ কিনব বলে একটি স্টলে ঢুকলাম। হরেক রকম ব্যাগের পসরা সাজানো ছিল সেখানে; কিন্তু ‘আই লাভ বাংলাদেশ’ লেখা একটি পাটের ব্যাগেই নজর আটকে গেল। সাধারণ একটি ব্যাগ, কোনো বাড়তি নকশা নেই। কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা লেখা থাকাতেই সেটি হয়ে উঠেছে বিশেষ। বরাবরই তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের কিংবা বাংলাদেশের স্মারক সংগ্রহের ঝোঁক বেশি দেখা যায়। নানা রূপের এই স্মারক সংগ্রহ করা তাঁদের সবার ঠিক নেশা নয়, এটা শুধুই ভালোবাসা। বেশ কয়েকজন তরুণের কাছে জানতে চেয়েছিলাম অফিস ডেস্কে পতাকা কেন রাখেন? অথবা বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা ওই মগটিই কেন বেছে নিলেন? সবার উত্তরই প্রায় অভিন্ন। ভালো লাগে, তাই করেন। আর এই ভালো লাগা কিংবা ভালোবাসার প্রকাশটা শুধু দিবসকেন্দ্রিক নয়। সারা বছরই তরুণেরা এ ভালোবাসা লালন করে চলেন। আর স্বাধীনতা বা বিজয় দিবস কিংবা বাংলাদেশের সাফল্যের কোনো উদ্‌যাপনে এই প্রকাশটা হয়ে ওঠে ব্যাপক।

দেশের কোনো উদ্‌যাপনে মাথায় লাল-সবুজ ব্যান্ডানা বাঁধতে দেখা যায়। পোশাক: কে ক্র্যাফটজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্র সাহিল নিহালকে প্রায়ই গাঢ় সবুজ রঙের একটি টি-শার্ট পরতে দেখা যায়। সেই টি-শার্টের মাঝখানে আবার একটি বড় লাল বৃত্ত। মানে বাংলাদেশের পতাকার আদলে তৈরি টি-শার্ট পরে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ান এই তরুণ। তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখনো গায়ে ওই একই পোশাক। এই টি-শার্টটি তাঁর এত পছন্দ কেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘এটা পরতে আমার কেন এত ভালো লাগে সেটা বলে বোঝাতে পারব না। তবে, দেশ ও দেশের জাতীয় পতাকার প্রতি অন্যরকম একটা আবেগ তো কাজ করেই।’ যোগ করেন, ‘আমার ব্যাগে সব সময় বাংলাদেশের একটা পতাকা থাকে। যেখানেই যাই মনে হয় দেশ আমার সঙ্গে আছে অথবা উল্টোভাবে বলা যায় আমি দেশের সঙ্গে আছি। আমি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, দেশের অনেক বড় বড় আন্দোলনে অংশ নিতে পারিনি। কিন্তু পতাকাটা সঙ্গে থাকলে দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করি। এটা একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আমি আসলেই এটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’

সাহিব বলেন, পতাকার টি-শার্টটি পরলে নাকি তাঁর নাম হয়ে যায় বাংলাদেশ। কীভাবে? দূর থেকে যখন কেউ তাঁকে এই টি-শার্ট পরা দেখে তখন ডাক দেয়, ‘এই বাংলাদেশ’ বলে। বিষয়টা বেশ গর্বের সঙ্গেই উপভোগ করেন এই তরুণ।
পতাকার আদলে তৈরি যে টি-শার্টটি আজকাল অনেককে পরতে দেখা যায়, তার তৈরি হওয়ার গল্পটাও বেশ মজার। ফ্যাশন হাউস নিত্য উপহারের স্বত্বাধিকারী বাহার রহমান সেই গল্প শোনালেন। তাঁর মুখ থেকেই সেটি তুলে দেওয়া হলো, ‘ঢাকার নীলক্ষেতে একবার আমার পরিচিত এক ছেলের পরনে লাল-সবুজ টি-শার্ট দেখে স্লোভাকিয়ার এক পর্যটকের খুব ভালো লেগে যায়। স্লোভাকিয়ার সেই পর্যটক বাংলাদেশের স্মারক হিসেবে এমন কয়েকটি টি-শার্ট তাঁর দেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এরপর আমার পরিচিত ছেলেটি তাঁকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। বলেন এমন কয়েকটি টি-শার্ট তাঁকেও বানিয়ে দিতে হবে। সেই পর্যটকের আগ্রহেই মূলত ২০০৫ সালে আমাদের ফ্যাশন হাউসে এই টি-শার্টগুলো নিয়ে আসি।’

িট–শার্ট: নিত্য উপহারশুধু কি পতাকা কিংবা টি-শার্ট? চাবির রিং, মুঠোফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের কভার, ডায়েরি, মগ, গয়না, পোস্টার নানাভাবে দেশ ও মুক্তিযুদ্ধ উঠে আসে তরুণদের প্রতিদিনের জীবনে।
স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে রাস্তায় বের হলেই যেমন মন ভালো হয়ে যায়। রিকশা, গাড়ি, অটোরিকশা, সাইকেল—সব যানবাহনে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায় বিশেষ এই দিনগুলোতে। বিডিসাইক্লিস্টের প্রশাসক ফুয়াদ আহসান চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে তাঁরা বিশেষ রাইডের আয়োজন করেন। সাইকেল আরোহীদের সেদিন লাল-সবুজ পোশাক পরে আসার জন্য উৎসাহিত করা হয়। নিজে থেকেই অনেকে আবার পতাকার রঙের ব্যান্ডেনা মাথায় বাঁধেন। সাইকেলের সামনে রেখে দেন ছোট একটি পতাকা। ফুয়াদ আহসান চৌধুরী বলেন, ‘হৃদয়ে যাঁরা লাল-সবুজ ধারণ করি, তাঁরা পোশাকেও এই রংটি বহন করতে ভালোবাসি। তবে দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে কোনোভাবে যেন আমাদের পতাকার অসম্মান না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা হয়।’

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে কথা হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছাত্রী সৈয়দা রুসেলী মেহনাজের সঙ্গে। নর্থ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী দেশে থাকাকালীন বাংলাদেশ বা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত এমন কিছু দেখলেই তা কিনে ফেলতেন। দেশে এলে এখনো কেনেন। অবশ্য এখন শুধু নিজের জন্য নয়; তাঁর বিদেশি বন্ধুদের জন্যও নিয়ে যান বাংলাদেশের নানা স্মারক। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর প্রথম যে স্বাধীনতা দিবস এসেছিল, সেদিন ভীষণ মন খারাপ ছিল তাঁর। বাংলাদেশে থাকলে এই দিনটিতে ছুটি কাটাতেন। লাল-সবুজ পোশাক পরে উদ্‌যাপন করা হতো স্বাধীনতা দিবসের নানা আয়োজন। প্রবাসে তো আর সেই সুযোগ নেই। তাই সে বছর ২৬ মার্চে নিজেই কাগজ কেটে জাতীয় পতাকার রঙে একটি ব্যাজ বানালেন। কাজে যাওয়ার সময় বুকের কাছে লাগালেন সেই ব্যাজ। রুসেলী বলেন, ‘সেদিন বিদেশিরা সবাই যখন আমাকে প্রশ্ন করছিল এটা কী পরেছ? আমার বলতে ভীষণ গর্ব হচ্ছিল যে, আজ আমাদের দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। নয় মাস লড়াই করার পর সেই মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী হই। আর এটি আমার স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকার রং।’

পোশাকে লাল-সবুজের ছোঁয়া। পোশাক: কে ক্র্যাফটসব শেষে বাহার রহমানের কথার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে বলতে হয়, ‘দেশের প্রতি ভালোবাসা সবাই প্রকাশ করতে চায়। এই প্রেম প্রকাশের ধরন একেক জনের কাছে একেক রকম। শুধু স্মারকে নয়, হৃদয়েও থাকতে হবে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। তবে, আমার মনে হয় স্মারক সংগ্রহ করতে করতেই একদিন সেই মানুষটির মনে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ জন্মাতে পারে। স্মারকের জায়গায় থাকবে স্মারক। প্রকৃত দেশপ্রেম ফুটে উঠবে ব্যক্তির সারা জীবনের কর্মকাণ্ডে।’

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন