জীবনযাপন     সংবাদ

শিশু

রঙে রাঙিয়ে দাও

রাফিয়া আলম | ২১ মার্চ ২০১৭, ০০:০৫  

রং-তুলির ছোঁয়ায় ডানা মেলুক মনের ভাবনাগুলো। মডেল: আনা, ছবি: নকশাশৈশবের স্মৃতি মনে পড়লে হয়তো রঙিন একটা ছবিই ভেসে ওঠে আপনার মনে; সময়টাই তো রঙিন! ছিল না কোনো চিন্তা, কোনো ব্যস্ততা। যেন রংতুলি দিয়ে সাজানো জীবন। রংতুলির বিষয়টা অবশ্য মজার। শিশুদের হাতে কাগজ, রং পেনসিল ধরিয়ে দিন। বন্ধ চার দেয়ালের মধ্যেও তারা মেলে ধরবে রঙিন চিন্তার পাখা। পাশাপাশি মানসিকভাবে উন্নয়নেও সহায়তা করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, ‘শিশুরা সামাজিক রীতিনীতির প্রতি খুব একটা ঝোঁকে না বা এগুলোর কোনো বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে তেমনভাবে গড়ে ওঠে না। তাই তাদের পছন্দের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো রীতিনীতি প্রভাব বিস্তার করে না। শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাদের মনের মতো জিনিসটি বেছে নেয়। রং বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। তাদের পছন্দের ওপর নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।’

শিশুরা কোনো একটি রঙের মূল রূপটিকেই বেছে নিতে পছন্দ করে। রঙের মিশ্রণ বা শেড তাদের পছন্দ নয়, এমনটাই জানালেন সঞ্জয় চক্রবর্তী। লাল, হলুদ, কমলার মতো উজ্জ্বল রংগুলো তাদের পছন্দ। তবে মন খারাপ থাকলে শিশুদের কালো বা ধূসর রং বেছে নিতেও দেখা যায় বলে জানালেন তিনি।

শিশুর হাতে কেমন রং

শিশুরা ড্রাই ক্রেয়ন (ড্রাই প্যাস্টেল), মোম প্যাস্টেল, রং পেনসিল, রঙিন চক ব্যবহার করতে পারে অনায়াসেই। তবে তাদের হাতে রং তুলে দেওয়ার আগে অবশ্যই বিষমুক্ত উপকরণে তৈরি করা রং বেছে নেওয়া উচিত। বাজারে রঙের প্যাকেটে অনেক সময় ‘নন টক্সিক’ কথাটা লেখাই থাকে। এ ধরনের রং বেছে নিতে পারেন। শিশুদের সেদিকে জোর করে ঠেলে না দিয়ে খেয়ালখুশিমতো রং করতে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

কোন বয়সে কেমন রং

ঢাকার মোহাম্মদপুরের সারগাম ললিতকলা একাডেমির ড্রয়িং সেকশনের দায়িত্বে থাকা ঐশিকা নদী বলেন, ‘শিশুদের রং শেখানোর সময় প্রথম দিকে আমরা অনেক দিন পর্যন্ত ওদের নিজেদের পছন্দমতো রং করতে দিই। সাধারণত মোম রং দিয়ে শুরু করা হয়। পরে ধীরে ধীরে তুলির ব্যবহার শেখানো হয়। তুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথমে পোস্টার রং এবং আরও পরে জলরং শেখানো হয়।’ দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা হয়তো পোস্টার রং দিয়ে আঁকছে, চতুর্থ বা পঞ্চম ছাত্রছাত্রীরা আঁকছে জলরং দিয়ে। আবার প্লে-গ্রুপ, নার্সারির শিশুরা কিংবা বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগের বয়সের শিশুরা মোম রং বা পেনসিল রং ব্যবহার করছে।

তবে শিশু ঠিক কোন মাধ্যমে রং করবে, সেটি শিশুর বয়স বা সে কোন শ্রেণিতে পড়ছে, তার ওপর সেভাবে নির্ভর করে না। বিষয়টি নির্ভর করে শিশুটির নিজস্ব ক্ষমতার ওপর, এমনটাই জানালেন ঐশিকা নদী। কোনো শিশু হয়তো কম বয়সেই তুলি ব্যবহার করতে শিখে যায়; কারও আবার একটু বেশি সময় লাগে বা সে হয়তো অন্য মাধ্যমে ভালো ছবি আঁকতে পারে।

লাল, নীল, হলুদ—এ তিনটি মৌলিক রং। এগুলোর সমন্বয়ে তৈরি হওয়া রঙের মাধ্যমে রঙের বৈপরীত্য সৃষ্টি করলে শিশুরা রঙের প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়। লালের বিপরীত সবুজ, নীলের বিপরীত কমলা, হলুদের বিপরীত বেগুনি—এমনিভাবে রংগুলো সাজিয়ে দিলে তা শিশুর কাছে আকর্ষণীয় হয়।

মানসিক বিকাশে রং

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. রশিদুল হক বলেন, একটি রং চেনার পর একই রঙের অন্য একটি জিনিস দেখলে পরের জিনিসটির সঙ্গে সে প্রথমটিকে মেলাতে চেষ্টা করে। সে গাছের সবুজ রংটাকে চিনতে পারলে হয়তো ভাববে, বাবা বলেছিল পতাকার রং সবুজ। আর কী কী সবুজ হয়, সে ভাবতে থাকে। এভাবে সে স্মৃতিতে প্রতিটি জিনিস সুন্দরভাবে গেঁথে নিতে পারে।

রং চেনানো না হলে তার বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলোতে যে রং ব্যবহৃত হয় (কম্পিউটার, মুঠোফোন বা ট্যাবের গেমস), তা শিশুর বিকাশে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। এগুলোতে বিভিন্ন রং বা আলো কয়েক সেকেন্ড পরপরই বদলে যেতে থাকে। ফলে শিশুর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। এতে তাদের স্মৃতিশক্তিও সঠিকভাবে গড়ে ওঠে না। অস্থিরতার কারণে এসব শিশু অন্যদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারে না। সে নিজেও সহজেই খুব বিরক্ত হয়ে পড়ে, মা-বাবাকে এবং অন্য শিশুদেরও বিরক্ত করে।

একবার কোনো রঙের মধ্যে হিংস্র (গেমসের দৃশ্যপটে মারা যাওয়ার সময় লাল রঙের ছাপ) কিংবা ভয়ের কোনো অনুভূতি (কালো অন্ধকারে ভয়) হলে শিশুর মধ্যে সেই রংটি নিয়েই ভীতি কাজ করতে পারে, এমনটাই জানালেন রশিদুল হক। পরবর্তীকালে সেই রংটি দেখলেই শিশু চিৎকার করে উঠতে পারে।

আঁকাআঁকি শেখাতে হয়

সঞ্জয় চক্রবর্তী জানালেন, শিশুকে আঁকাঝোঁকার নির্দেশনা দেওয়ার অর্থই হলো তার সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করে ফেলা। এটিই সবচেয়ে বড় ভুল। আজকাল অনেক স্থানেই শিশুদের আঁকা শেখানোর প্রতিষ্ঠান থাকে। শিশুর আঁকাঝোঁকায় তার মনের আনন্দ-বিষাদ ফুটে ওঠে বলে মা-বাবাও এগুলো খেয়াল করতে পারেন এবং শিশুর মানসিক অবস্থা ও মানসিক স্তর সম্পর্কে বুঝতে পারেন। তবে বিষয়টির গভীরেই সব সময় যেতে হবে তা নয়। নির্মল আনন্দকর কিছু মুহূর্ত কাটানোর জন্যও রং পেনসিল হতে পারে আদর্শ পছন্দ।

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন