জীবনযাপন     সংবাদ

বন্ধু ছিলাম বন্ধু হলাম

রিফাত আনজুম | ১৫ মার্চ ২০১৭, ০১:৩৬  

ওদের দুজনের গলায়-গলায় বন্ধুত্ব। লোকে ডাকে ‘মাণিকজোড়’। হঠাৎ কী যে হলো! কথা বলাবলি, মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এ বন্ধু ডানে গেলে, ও বন্ধু বাঁয়ের পথ ধরে। হয়তো একজনের কোনো কথায় বা আচরণে আরেকজন ভীষণভাবে আহত হয়েছে, হয়তো বন্ধুকে পাশে পায়নি প্রয়োজনে, হয়তো ঘটেছে বিশ্বাসভঙ্গের কোনো ঘটনা। মান-অভিমান, রাগ-ক্ষোভ, তিক্ততায় ধুঁকে ধুঁকে কোনো কোনো বন্ধুত্বের জীবনীশক্তি এভাবেই নিঃশেষ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ধ্বংসস্তূপের মাঝ থেকেও নতুন করে বেঁচে ওঠে বন্ধুত্ব। বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান আর পরিচালক ফারাহ খানের কথাই ধরুন। দুজনের দারুণ বন্ধুত্বের কথা কে না জানে! এক পার্টিতে ফারাহর স্বামী শিরীষ কুন্দারকে শাহরুখ চড় মেরে বসলে চিড় ধরে বন্ধুত্বে। শাহরুখ-ফারাহ এড়িয়ে চলতে শুরু করেন একে অন্যকে। কিছুদিন শীতল সময় কাটিয়ে নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে তাঁরা আবার হাতে হাত মিলিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, অনেকেই আছেন, যাঁরা শুধু নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে একটা ঘটনাকে বিচার করেন। এই একরোখা একমুখী মনোভাব যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ঝামেলা তৈরি করে। অতিরিক্ত অধিকারপ্রবণতাও ভুল-বোঝাবুঝির জন্ম দেয়। যিনি বন্ধুর সঙ্গে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চাইছেন, তাঁর নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে, কেন এই বন্ধুত্ব তিনি রক্ষা করতে চান। এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যদি কিছু ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তার জন্য তিনি প্রস্তুত কি না। বন্ধু কোনো ভুল করে থাকলে মন থেকে তাঁকে ক্ষমা করতে পারছেন কি না। যদি ঝোঁকের মাথায় গোঁজামিল ভাবনায় বিবাদ মিটিয়ে ফেলেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে সমস্যা মাথাচাড়া দিতে পারে।

হায় মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি, গেলাম কে কোথায়...
অনেকের সঙ্গেই তো বন্ধুত্ব হয়, আবার ঝরেও যায়। সবার সঙ্গে আত্মার সংযোগ ঘটে না। তাই সব বন্ধুত্ব ভাঙা নিয়ে তেমন তোলপাড়ও হয় না জীবনে। কিন্তু যখন কাছের বন্ধুটির সঙ্গে বিবাদ গিয়ে ঠেকে বিচ্ছেদে, তখন গভীর শূন্যতা গ্রাস করে ভেতরটাকে। ভেঙে যাওয়া বন্ধুত্ব কি আপনা-আপনি জোড়া লাগে? কখনো বহুদিনের নীরবতা, শীতলতার পর হঠাৎ দেখায় দীর্ঘদিনের জমাট বরফ এমনিই গলে যায়। কবীর সুমনের গান এখানে প্রাসঙ্গিক:
সময় চলে গেছে এবং চলছে
চলতি জীবনের গল্প বলছে
পাল্টে গেলি তুই
আমিও পাল্টে গিয়েছি মাঝপথে
হাঁটতে হাঁটতে
বন্ধু, কী খবর বলো?
কত দিন দেখা হয়নি।

কোনো সম্পর্ক ভেঙে গেলে নিজের দিকে তাকানো উচিত। নিজের আচরণের বিশ্লেষণ জরুরি। বন্ধুর জায়গা থেকে বোঝার চেষ্টা করুন। নিজের দায়টুকু স্বীকার করে নিন

তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এত সহজে ফিরে আসে না হারানো বন্ধুত্ব। আন্তরিক চেষ্টা চালাতে হয় সম্পর্কের পুনরুদ্ধারে। কখনো তৃতীয় কেউ এসে মিলিয়ে দিতে পারে দুজনকে। শাহরুখ-ফারাহর বেলায় যেমন শাহরুখের স্ত্রী গৌরী এগিয়ে এসেছিলেন। তবে পদ্ধতি যেটাই হোক কাছের বন্ধুর সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে ফেলাই ভালো। তা না হলে এ তিক্ততা নেতিবাচক ছাপ ফেলে অবচেতনে। তা মানসিকভাবে তো বটেই, শারীরিকভাবেও আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। খাঁটি বন্ধুত্ব বিরল। দু-একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুকে দূরে ঠেলে দেওয়া নিতান্ত বোকামি। তাই কোনো ভুল-বোঝাবুঝি, কথা-কাটাকাটিতে দুজন দুদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে না থেকে সমাধানের কথা ভাবা উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক মেরামতে কিছু পরামর্শ।
১. নিজেকে জানুন: কোনো সম্পর্ক ভেঙে গেলে নিজের দিকে তাকানো উচিত। নিজের আচরণের বিশ্লেষণ জরুরি। বন্ধুর জায়গা থেকে বোঝার চেষ্টা করুন। নিজের দায়টুকু স্বীকার করে নিন। ও আগে এগিয়ে আসুক—এই জেদ নিয়ে দুজনই বসে থাকলে মীমাংসা হবে না কখনো।
২. কথা বলুন: যোগাযোগহীনতাই যেকোনো সম্পর্ককে জটিলতার জালে পেঁচিয়ে ফেলে। কল্পনায় সাতপাঁচ ভেবে তিলকে তাল বানিয়ে ফেলেন অনেকেই। তাই মন খুলে কথা বলুন। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করুন, নিঃসঙ্কোচে স্যরি বলুন। বন্ধুকে কথা বলতে দিন। ধৈর্য নিয়ে তার সব কথা শুনুন। বন্ধুত্ব রক্ষায় আপনি যে আন্তরিক তা বুঝতে দিন। বন্ধুর ভুলগুলো মন থেকে ক্ষমা করতে না পারলে তা নিজেকেই
স্বস্তি দেবে।
৩. অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন: জোড়া লাগা বন্ধুত্ব সব সময় আগের চেহারা পায় না, তবে এ থেকে শেখার আছে। নিজেরা নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো জানুন, যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকুন। নিজেদের ভিন্নতাকে মেনে নিন। বন্ধুত্বে ভাঙন অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এ থেকে শিখতে পারলে পরবর্তীকালে বোঝাপড়া দৃঢ় হয়। এ অভিজ্ঞতা আমাদের মানসিকভাবে পরিণত করে তোলে। অন্যের মনস্তত্ত্ব বুঝতে সাহায্য করে।
জীবনের একেক স্তরে বন্ধুত্ব একেক চেহারা নেয়। চাকরিতে পদোন্নতি বা বদলি, নতুন সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তানের জন্ম—জীবনের এ রকম নানা বাঁকবদলের ঘটনা বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলে দেয়। বন্ধুত্বের মূল সুরটা যদি অক্ষুণ্ন থাকে, তবে এই পরিবর্তনগুলো মেনে নিতে পারাটা মানসিক পরিপক্বতার লক্ষণ। এ নিয়ে কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়ুয়া দুই বন্ধু লিলি আর মিরানার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। মিরানা বললেন, ‘লিলি আর আমি একসঙ্গে সবখানে ঘোরাঘুরি করতাম। দুজন দুজনের সঙ্গে কথা না বললে পেটের ভাত হজম হয় না এই অবস্থা! ডিপার্টমেন্টেরই একটা ছেলের সঙ্গে ওর সম্পর্ক হলে আমাদের ঘোরাঘুরি, যোগাযোগ একদম কমে যায়। শুরুতে খুব মন খারাপ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম জীবনের একেক স্তরে বন্ধুত্ব একেক রকম। ওকে স্পেস দিতে পারাটাও বন্ধুত্ব। সব সময় ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতে হবে এমন না। আমার যখন জন্ডিস হলো, ও নিয়মিত দেখতে আসত। এটাই তো বন্ধুত্বের পরিচয়, তাই না?’ এবার লিলি বলেন, ‘সবকিছু প্রেমিকের সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। প্রেমে কিছু সংকীর্ণতা থাকে, যেটা বন্ধুত্বে নেই। বন্ধুত্বকে তাই অবহেলা করিনি।’

সখা, প্রাণের মাঝে আয়
বন্ধুত্বের ধারণা ব্যাপক, বিচিত্র ও বহুমাত্রিক। প্রাণের কথা অকপটে যাকে বলা যায়, সে-ই তো বন্ধু। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা আপনজন। ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা, যোগাযোগ, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা বাঁচিয়ে রাখে বন্ধুত্বকে। জেদ আর অভিমানের নিচে চাপা পড়েছে যে বন্ধুত্ব, তাকে আবার মুক্ত করা যায় ভালোবাসায়। তাতে আমরাও মুক্ত হই বহু নেতিবাচক অনুভূতির কবল থেকে।

 

পাঠকের মন্তব্য (১)

  • vfxsameer

    vfxsameer

    There Is Nothing Like Freindships, Every Person Need A Good Freind In Their Life,Only Freinds Can Understand Our Situation Better More Than Anyone.
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন