শিক্ষা     সংবাদ

মধুদা

ছেলের মুখে বাবার গল্প

আসিফুর রহমান | ১৯ মার্চ ২০১৭, ০০:২৫  

মধুসূদন দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। এই এলাকায় ক্যানটিন চালানোর সুবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল তাঁর সম্পর্ক। মধুর ক্যানটিন হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি-সংস্কৃতির সূতিকাগার। ১৯৭১ সালে অপারেশন সার্চলাইট নামে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তারই শিকার হয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের প্রিয় মধুদা। ‘স্বপ্ন নিয়ে’র আয়োজনে এ প্রজন্মের তরুণদের কাছে মধুদার গল্প বলেছেন তাঁর ছেলে অরুণ কুমার দে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে বসে এ প্রজন্মের তরুণদের কাছে বাবার গল্প শোনাচ্ছেন অরুণ দে (ডান থেকে চতুর্থ)। ছবি: খালেদ সরকার‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ঢাকায় যে থমথমে অবস্থা ছিল, তার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। রাতের বেলায় সমানে কাক ডাকত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাকিস্তানি বাহিনীর জিপের শব্দ আর হেডলাইটের আলো ছাড়া কোনো আলো নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের গাছগুলোতে তখন শকুনের ওড়াউড়ি...’

বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের তত্ত্বাবধায়ক অরুণ কুমার দে। যে মধুদার (শহীদ মধুসূদন দে) নামে এই ক্যানটিন, অরুণ কুমার দে তাঁর ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ১১ কি ১২। ওই বয়সেই চোখের সামনে মা-বাবা, বড় ভাই-বৌদিকে হারিয়েছেন।

সেই সব দিনের সাক্ষী অরুণ দের কাছে ঘটনার বর্ণনা শুনতে গত বুধবার মধুর ক্যানটিনে হাজির হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১২ জন শিক্ষার্থী। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের এসব শিক্ষার্থীর জিজ্ঞাসা যেমন এই ক্যানটিনকে ঘিরে, তেমনি তাঁরা শুনতে চেয়েছেন মধুদার কথা। তখনকার ছোট্ট সেই ছেলেটি যতটুকু জানেন, উত্তর দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্মকে। তাঁর ভাষায়, ‘এটা তো আমার দায়িত্ব। এখনকার ছেলেমেয়েদের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ কম। কেউ তো এভাবে আসে না।’

ফলিত গণিত বিভাগের ছাত্রী জুমারিয়া বিনতে জাকারিয়া জানতে চান ১৯৭১ সালে অরুণ দের পরিবারের অবস্থা সম্পর্কে। অরুণ দে বলেন, ‘২৫ মার্চ সারা রাত ধরে চলে তাণ্ডব। একদিকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার, অন্যদিকে গুলির শব্দ। জগন্নাথ হলের পাশেই ছিল আমাদের বাসা। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। বাতি বন্ধ। পুরো রাস্তা ফাঁকা। এমন অবস্থায় ছেলেদের হল, মেয়েদের হল, শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা—সব জায়গায় আক্রমণ শুরু হয়। সেনারা জগন্নাথ হলে ঢুকে যাকে যেখানে পেয়েছে, সেখানেই গুলি করেছে। কর্মচারীদের টিনশেড আবাসিক এলাকা পুরোটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটা যে কত বড় ভয়াবহতা, না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না।’

অরুণ দে বলেন আর উন্মুখ হয়ে শোনেন শিক্ষার্থীরা। ‘সারা রাত্রির তাণ্ডব শেষে ভোরবেলা আমাদের বাসায় আক্রমণটা করে। একতলায় এসে জিজ্ঞেস করে, বাবা কোথায় থাকেন। পরে চারতলায় উঠে আসে। দরজা ধাক্কাতে থাকে। বাবা দরজা খুলে দেন। ১২-১৪ জনের একটা দল চারদিক থেকে ঘিরে বাবাকে পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দায় নিয়ে দাঁড় করায়। একজন ঘরের ভেতরে ঢুকে ছবি-আসবাব সব তছনছ করে ফেলে।’

তারপর? শিক্ষার্থীরা জানতে চান।

‘প্রথমে বড় ভাইকে হত্যা করে। বড় ভাই নতুন বিয়ে করেছেন ছয় মাস আগে। বৌদিকে গুলি করে। এর একটা আমার ছোট দিদির গায়ে লাগে। পরে বাবাকে মারতে গেলে মা তাঁকে জড়িয়ে ধরে রাখেন। বলেন, আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে, আমার স্বামীকে ছেড়ে দাও। এ সময় মাকে লক্ষ্য করে একটা গুলি চলে। বাবার ডান হাতে গুলি লাগে। সে অবস্থায় তিনি বসে পড়েন। তিনি কাঁদছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মিশন শেষ করে পাকিস্তানিরা চলে যায়।’

ততক্ষণে টেবিলজুড়ে নিস্তব্ধ নীরবতা নেমে এসেছে। অরুণ দে বলেই চলেন, ‘বাবা তখনো মারা যাননি। পাকিস্তানিরা চলে যায়। ঘণ্টাখানেক পর দুজন বাঙালি এসে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। জগন্নাথ হলের মাঠে তাঁকেসহ আরও অনেককে ব্রাশফায়ার করা হয়। বিরাট করে গর্ত খুঁড়ে মৃত-অর্ধমৃত সবাইকে এখানেই পুঁতে দেয় ওরা।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু করার ছিল না। আমরা যারা ছোট ছিলাম, আমাদের মাথার চুল ধরে দেয়ালে মাথা ঠোকায়। বুকে-পেটে লাথি মারে। বড়দের কাউকে ছাড়েনি। তিনটি লাশ আর আহত বোনকে নিয়ে তিন দিন পর্যন্ত আমরা বাসায় ছিলাম। কীভাবে যে দিনগুলো কেটেছে, বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’

২৭ মার্চ কারফিউ ছেড়ে দিলে অরুণরা সাত ভাই-বোন এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় বিক্রমপুরে দেশের বাড়ি যান। চার দিন চার রাত হেঁটে পৌঁছে যান ভারতের ত্রিপুরায়। সেখানেই কাটে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস। দেশ স্বাধীন হলে ফিরে আসেন। এসে দেখেন পুরো ক্যানটিন ভেঙে ফেলা হয়েছে। তখনকার ছাত্রনেতাদের সহযোগিতায় সংস্কার শেষে নতুন করে চালু হয় মধুর রেস্তোরাঁ। কেবল ছিলেন না সবার প্রিয় মধুদা।

বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন মধুসূদন দে—এক শিক্ষার্থীর এমন প্রশ্নের জবাবে অরুণ দে বলেন, ‘অসাধারণ। আমার ভাগ্য, আমি আমার বাবার মতো বাবা আর মায়ের মতো মা পেয়েছি। মায়ের কাছে তো আদর পেতাম, কিন্তু দুষ্টু ছিলাম তো, বাবার শাসন ছিল। রাগ দেখাতেন মাঝেমধ্যে। ওই শাসনটা ছিল বলেই আজ তাঁর দায়িত্বটা পেয়েছি।’

পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে মেজ অরুণ দের নতুন করে শুরু মুক্তিযুদ্ধের পর। ক্লাস ফাইভে পড়েন। ওই সময় থেকেই মধুর ক্যানটিনে যাওয়া-আসা করেন, একপর্যায়ে হাল ধরেন। স্কুলে যেতেন, চারটায় স্কুল ছুটি হলে ক্যানটিনে আসতেন। মেট্রিক পাস করার পর সিটি কলেজে রাত্রিকালীন কোর্সে ভর্তি হন। সারা দিন ক্যানটিনে কাজ করে সন্ধ্যায় ক্লাস করে বাসায় যেতেন। এভাবেই এগিয়েছে জীবন।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র জি এম হিরকের জিজ্ঞাসা, ‘আপনার বাবা তো রাজনীতি করতেন না, তবু কেন পাকিস্তানিদের এত আক্রোশ ছিল?’ উত্তরে অরুণ দে তাঁর বাবার গল্প শোনালেন এভাবে—মধুসূদন দে রাজনীতি করতেন না ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, তাঁদেরকে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। যাঁরা আত্মগোপনে ছিলেন, কে কোথায় আছেন, তিনি জানতেন। তাঁরাও মধুদাকে ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করতেন না। মধু দার কাছে চিঠি লিখতেন, ‘খেয়ে না-খেয়ে আছি।’ মধুদা জায়গামতো খাবার পাঠিয়ে দিতেন। টাকাপয়সা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। তিনি কি অনেক প্রভাবশালী ছিলেন? না। বড়লোকও ছিলেন না। তবে তাঁর মনটা ছিল অনেক বড়। নিজের সন্তানদের চাইতে এই ছাত্রছাত্রীদের বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই বিষয়টি মধুসূদন দে তাঁর বাবা আদিত্যচন্দ্র দের কাছ থেকে শিখেছিলেন জানিয়ে অরুণ দে বলেন, ‘ঠাকুরদা ১৯২১ সালে ক্যানটিন শুরু করেন। তখন এটা ছিল বর্তমান মেডিকেল কলেজের বটতলার কাছে। বাবার বয়স যখন ১২ বছর, তখন ঠাকুরদা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা গ্রামে পড়াশোনা করতেন তখন। খবর পেয়ে ঢাকায় এলে শয্যাশায়ী ঠাকুরদা তাঁকে বলেন, ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের সেবার দায়িত্বটা যেন বাবা নেন। সেই দায়িত্ব যথাযথ পালন করে, বিশ্বস্ততা অর্জন করেই তিনি সবার প্রিয় “মধুদা” খেতাব পান।’

দর্শন বিভাগের অনিন্দ্য জাহিদ জানতে চাইলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া মধুর ক্যানটিনের আর কী ঐতিহ্য আছে? অরুণ দের উত্তর, ‘মধুর ক্যানটিনের মূল হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি। এখানে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই আসবে। সংসদে যেমন বসে, পাশাপাশি টেবিলে বসবে। মধুর ক্যানটিনকে কিন্তু মিনি পার্লামেন্ট বলা হয়। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্র্যাকটিসটা তারা এখান থেকেই করে যেত। কিন্তু ১৫ বছর ধরে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। তা ছাড়া অনেকের জানা যে এটি একসময় নবাবদের জলসাঘর ছিল। এখানে বসেই ঐতিহাসিক মুসলিম লীগের জন্ম।’

শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যত আন্দোলন-সংগ্রামের সূত্রপাত, তার বেশির ভাগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই মধুর ক্যানটিন। এখানে বসে শিক্ষার্থীরা যেমন ইতিহাস জানতে চান, তেমনি জানতে চান কেন চায়ের কাপে চা না দিয়ে গ্লাসে দেওয়া হয়? ছাদের দিকটা কেন লাল-সবুজের পতাকার রঙে রাঙানো? বর্তমান ছাত্ররাজনীতি কেমন চলছে? ডাকসু কেন নেই? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খায় শিক্ষার্থীদের মনে।

আড্ডা শেষে ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী প্রীতি রানী নাথের মন্তব্য, ‘আমি তো ভাবতাম এখানে কেবল চা-নাশতাই পাওয়া যায়। এর পেছনে যে এত ইতিহাস জড়িত তা আড্ডায় না এলে জানতে পারতাম না।’

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন