অর্থনীতি     সংবাদ

মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে বিমা কোম্পানির নিরীক্ষা বন্ধ

ফখরুল ইসলাম | ২১ মার্চ ২০১৭, ০০:০৮  

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রথমে একটি কোম্পানির ওপর নিরীক্ষা বন্ধ রাখতে চিঠি দেয় আইডিআরএকে। আর এ উদাহরণ সামনে থাকায় অন্য কোম্পানিগুলোর ওপর চলমান নিরীক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বেআইনি হস্তক্ষেপে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নিরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এ ঘটনায় বিমা আইনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। কমে গেছে বিমা কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণক্ষমতাও।

দেশের বেশির ভাগ সাধারণ বিমা (নন-লাইফ) কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খরচের নামে ইচ্ছেমতো টাকা খরচ করে আসছে বলে কয়েক বছর থেকেই পর্যবেক্ষণ ছিল আইডিআরএর। গত বছরের শেষ দিকে আইডিআরএ তাই ২৫টি কোম্পানির ওপর বিশেষ নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু আইডিআরএ নিরীক্ষাগুলো করাতে পারেনি। কারণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রথমে গ্রীণ ডেল্টা ইনস্যুরেন্সের ওপর নিরীক্ষা বন্ধ রাখতে চিঠি দেয় আইডিআরএকে। আর এ উদাহরণ সামনে থাকায় অন্য কোম্পানিগুলোর ওপর চলমান নিরীক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
গত ২৩ অক্টোবর থেকে এ বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় বিমা কোম্পানিগুলোতে দেশের নামকরা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। নিরীক্ষক নিয়োগ পাওয়া বিমা কোম্পানিগুলো হচ্ছে—রিপাবলিক, এক্সপ্রেস, কন্টিনেন্টাল, ফিনিক্স, গ্রীণ ডেল্টা, প্রগতি, ইউনিয়ন, ফেডারেল, পাইওনিয়ার, বাংলাদেশ ন্যাশনাল, জনতা, নর্দান জেনারেল, তাকাফুল, সোনার বাংলা, মেঘনা, ইউনাইটেড, গ্লোবাল, রিলায়েন্স, দেশ জেনারেল, প্রাইম, ঢাকা, সেন্ট্রাল, পিপলস, রূপালী এবং ইসলামী ইনস্যুরেন্স কোম্পানি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের এ হস্তক্ষেপ ভুল বার্তা দিচ্ছে। তা ছাড়া আইন যেখানে আইডিআরএকে নিরীক্ষা করানোর ক্ষমতা দিয়েছে, মন্ত্রণালয় সেখানে কিছুই না। বিমা খাতের স্বার্থেই নিরীক্ষক নিয়োগের অবৈধ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা উচিত।’
বিমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী যেকোনো বিমা কোম্পানির কার্যক্রম নিরীক্ষা করাতে পারে আইডিআরএ। এর আগে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ নিরীক্ষা করিয়ে ফলও পেয়েছে সংস্থাটি।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলার কথা জানিয়ে নিরীক্ষা কার্যক্রম তিন মাস পেছানোর দাবিতে আইডিআরএর কাছে প্রথম আবেদনটি করে এক্সপ্রেস ইনস্যুরেন্স কোম্পানি। পরে গ্রীণ ডেল্টা ইনস্যুরেন্স একই ধরনের আবেদন করে। বিমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনও (বিআইএ) নিরীক্ষা বন্ধ করতে কোম্পানিগুলোর পাশে দাঁড়ায়।
বিআইএ সভাপতি শেখ কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১০ সালের আইনের পর অনেক বিধি এখনো হয়নি। ১৯৫৮ সালের বিধি অনুযায়ী নিরীক্ষা হলে তা যথার্থ হবে না। এ কারণেই নিরীক্ষা স্থগিত রাখতে আমরা অনুরোধ করেছি।’
কিন্তু প্রবিধানমালার সঙ্গে নিরীক্ষা কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ‘আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে নিরীক্ষার সময় পেছানোর সুযোগ নেই’ জানিয়ে সব আবেদন নাকচ করে দেয় আইডিআরএ। নাকচ হওয়ার পর গ্রীণ ডেল্টা ইনস্যুরেন্স গত ২৭ ডিসেম্বর নিরীক্ষা স্থগিতের আবেদন করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। বিভাগটি তখন আইডিআরএকে চিঠি দিয়ে নিরীক্ষা স্থগিত রাখার কথা জানায়।
আর এই চিঠিই আইডিআরএর গোটা নিরীক্ষা কার্যক্রম আটকে দেয় বলে জানা গেছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ এ ব্যাপারে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমানকে এক চিঠিতে বিমা কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন।
চিঠিতে শেফাক আহমেদ বলেন, নিরীক্ষক নিয়োগ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ কার্যক্রম স্থগিত করা হলে কোম্পানিগুলোর ওপর আইডিআরএর নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
বেসরকারি ১৭টি জীবন বিমা কোম্পানির ২০১২ সালে বিমা আইন অনুযায়ী অনুমোদিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা খরচ ছিল ৩৫৮ কোটি টাকা। ধারাবাহিক বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি নিরীক্ষা করিয়ে আইডিআরএ এ খরচকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দেওয়ার কারণেই ২০১৬ সাল শেষে কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা খরচ ৮৪ কোটি টাকায় নেমে আসে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা খরচ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
অবৈধ হস্তক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এটা সাময়িক পদক্ষেপ। কিছুদিন পর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
আইন তোয়াক্কা না করে অযাচিত হস্তক্ষেপ আসলে কার স্বার্থে বা কাদের স্বার্থে-আবারও জানতে চাইলে সচিব কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পাঠকের মন্তব্য (৩)

  • সোলায়মান

    সোলায়মান

    ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলো একদিকে যেমন বীমার বিপরীতে ক্ষতিপূরণ দিতে চায় না। অন্যদিকে শেয়ার হোল্ডারদের লভ্যাংশও দেয় না। তাহলে অর্জিত টাকা যায় কোথায়?
     
  • সোলায়মান

    সোলায়মান

    সরকার সব জায়গায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়। এই সচিবের আদেশ কি স্বচ্ছতার বিপরীত নয়?
     
  • Saiful Masud

    Saiful Masud

    আইন তোয়াক্কা না করে অযাচিত হস্তক্ষেপ আসলে কার স্বার্থে বা কাদের স্বার্থে-আবারও জানতে চাইলে সচিব কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। - !!!
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন