অর্থনীতি     সংবাদ

ইসলামপুরে ভোটের আমেজ

শুভংকর কর্মকার | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০৮  

ছয় বছর পর সরাসরি ভোটে ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই প্রার্থীদের পোস্টার–ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরান ঢাকার ইসলামপুর। গতকাল দুপুরে ছবিটি তুলেছেন হাসান রাজারংবেরঙের কাপড়ের মতোই রঙিন পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো ইসলামপুর। সড়ক আর অলিগলিতে দড়িতে বেঁধে এত পোস্টার লাগানো হয়েছে যে কিছু জায়গায় দাঁড়িয়ে নীল আকাশই দেখা যায় না। আহসান মঞ্জিলের সীমানাপ্রাচীরে লাগানো হয়েছে পোস্টার আর ব্যানার। সে জন্য বাইরে থেকে নবাবদের প্রসাদের সৌন্দর্য চোখে পড়ছে না।

পুরান ঢাকার ইসলামপুরে এত পোস্টারের পেছনের কারণ হচ্ছে ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন। ছয় বছর পর সমিতির নেতৃত্ব নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। সে জন্য ইসলামপুরজুড়ে এখন নির্বাচনী আমেজ। উৎসবের এলাকায় পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বড় কাপড়ের এই পাইকারি বাজার।

আগামী তিন বছরের জন্য সমিতির কার্যকরী পরিষদের ৪১ পদের এই নির্বাচনে দুটি প্যানেলে ৮১ জন ব্যবসায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সামসুল হক ও নেছার উদ্দিন মোল্লা পরিষদের নির্বাচনী প্রতীক গোলাপ। এই প্যানেলের মমিন আলী অবশ্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোষাধ্যক্ষ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সামসুল আলম সবজল ও মাসুদুর রহমান সোহেল (সবজল-সোহেল) পরিষদের নির্বাচনী প্রতীক ছাতা।

সমিতির কর্মকর্তারা বলেন, ২০১০ সালের পর সরাসরি ভোটে সমিতির নির্বাচন হয়নি। এবারের নির্বাচনে ৩ হাজার ৯৪৬ জন ব্যবসায়ী ভোট দেবেন। আহসান মঞ্জিল সুপার মার্কেটে আগামীকাল শনিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ চলবে।

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সমাবেশ করেছে দুই পরিষদ। ইসলামপুর পুলিশ ফাঁড়ির সামনের সড়কে সকালে সমাবেশ করে সামসুল হক ও নেছার উদ্দিন পরিষদ। বিকেলে চায়না মার্কেটের সামনের সড়কে সমাবেশ করে সবজল-সোহেল পরিষদ। সড়কের ওপর মঞ্চ নির্মাণ করে সমাবেশের আয়োজন করেন উভয় পরিষদের নেতারা। এ জন্য ইসলামপুরের মূল সড়কের বড় অংশে গতকাল দিনের বেলায় যান চলাচল বন্ধ ছিল।

ইসলামপুরের বিভিন্ন মার্কেটে প্রায় আট হাজারের মতো কাপড়ের পাইকারি দোকান আছে। সঠিক হিসাব না থাকলেও বছরে আনুমানিক ১৫-২০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় এসব দোকানে। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এখানে কাপড় কিনতে আসেন। তবে গতকাল ভর দুপুরে পুরো এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ কাপড়ের দোকানই ফাঁকা। ক্রেতা নেই।

কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলছে। পোস্টার, ব্যানার আর স্টিকারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। প্রতিদিনই হ্যান্ডমাইক, ব্যান্ড পার্টি ও ভুভুজেলা নিয়ে মিছিল করছেন প্রার্থীরা। দোকানে দোকানে গিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছেন প্রার্থীরা। নিয়মিত ক্রেতারা বিষয়গুলো স্বচক্ষে দেখেই হয়তো ভোটের আগমুহূর্তে ইসলামপুরে আসছেন না।

এদিকে উভয় প্যানেলের প্রার্থীরাই ভোটারদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছেন তাঁরা। দুই প্যানেলের মধ্যে ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতীক বণ্টন করা হয়। গতকাল মধ্যরাতে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে।

জানতে চাইলে সামসুল হক ও নেছার উদ্দিন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী নেছার উদ্দিন মোল্লা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্যানেল বিজয়ী হলে ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চাঁদাবাজি ও মূসক নিয়ে হয়রানি বন্ধ করব। এ ছাড়া ব্যবসাসংক্রান্ত স্থানীয় সালিসি ব্যবস্থা উন্নত ও তিন বছর পরপর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমিতির নির্বাচন করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।’

নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী এই প্যানেলে সভাপতি প্রার্থী মো. সামসুল হক। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসমুক্ত ইসলামপুর গড়তে চাই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করব।’

অন্যদিকে সবজল-সোহেল প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী মাসুদুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিজয়ী হলে ইসলামপুরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য একটি কল্যাণ তহবিল করব। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি পুরো এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। এ ছাড়া কাপড় আমদানি ও মূসক নিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধের উদ্যোগ নিব। পরপর দুই বারের বেশি কেউ যাতে সমিতির নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে।’

এই প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী সামসুল আলম বলেন, ‘২৫ বছর ধরে ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের জন্য কাজ করছি। তাঁরাই আমার কাজের বিচার করবেন। এবার নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীরা যেসব জায়গায় হয়রানির শিকার হন, সেগুলো বন্ধ করাই হবে আমাদের মূল কাজ।’

ইসলামপুর থেকে ফেরার পথে আলী আকবর ও মোবারক মিয়া নামের দুই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলো। তাঁরা বলেন, ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করতে পারবেন ভেবে তাঁরা খুশি। দুই প্যানেলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার কথা। তবে তাঁদের আক্ষেপ, ভোটে জেতার জন্য প্রার্থীরা অনেক ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি দেন। পরে সেগুলো বেমালুম ভুলে যান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমিতির পরবর্তী নেতৃত্ব কি সাধারণ ব্যবসায়ীদের এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবেন?

 

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন