দূর পরবাস     সংবাদ

দেশের সীমানা পেরিয়ে বসন্ত উৎসব

রক্তকরবী, নেদারল্যান্ডস থেকে | ২০ মার্চ ২০১৭, ১৯:৩৮

কৌতুক নাট্যের একটি দৃশ্যনেদারল্যান্ডস দেশটি ছোট আর বাংলাদেশি বলতে মোটে সব মিলে হাজার-বারো শ। কিন্তু তাতে কি? বাংলাদেশে বার মাসের তেরো পার্বণের কোনটিই তারা পালন করতে ছাড়েন না। নেদারল্যান্ডসের বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রাণ হলো হেগের বাংলাদেশ দূতাবাস। যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় ছোট্ট এই জনগোষ্ঠী। যেখানে এসে তারা খুঁজে নেয় বাংলা মায়ের ঘ্রাণ। দূতাবাসের পাশাপাশি ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘প্রবাস’, ‘সোনার বাংলা’ ও ‘বাংলা ইউনাইটেড’–এর মতো বাঙালি সংগঠনগুলোও যথেষ্ট সক্রিয়। দূতাবাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেমন তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তেমনি নিজেরাও আয়োজন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কিছু।

সমবেত কণ্ঠে আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোটে কত পাখি গায়আর এই বসন্তকে স্বাগত জানাতেই গত শনিবার (১৮ মার্চ) হল্যান্ডের ছিমছাম শহর আইন্দহোভেনে ছিল সীমানা পেরিয়ের রঙিন আয়োজন। আর হবেই বা না কেন? টিউলিপের রাজ্য নেদারল্যান্ডসে বসন্ত আসে ফুলের সুবাস নিয়ে। বসন্ত আসে সবুজ পাতায় ভর করে নতুনের বার্তা নিয়ে। বসন্তে যিনিই নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ বাগানের সৌন্দর্য দেখেছেন তিনিই স্বীকার করবেন পৃথিবী নামক নক্ষত্রটিতে ওই মুহূর্তে এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর দ্বিতীয়টি নেই।
রাষ্ট্রদূতকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে আরিনা ও সাহালমার্চের তৃতীয় সপ্তায় শীত যখন যাই যাই করছে ঠিক তখনই বাঙালির হৃদয়ে রঙের ছটা দিতে সীমানা পেরিয়ের এই বসন্ত উৎসব। আয়োজন আর গণসংযোগ যেমন ছিল জোরালো, সাড়াও মিলেছে যথেষ্ট। নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহম্মদ বেলাল আর তার সহধর্মিণী ড. দিলরুবা নাসরিন শুধু অনুষ্ঠানে উপস্থিতই ছিলেন না, এ উপলক্ষে দিয়েছেন আগাম বার্তা। এই ছোট কমিউনিটির শ দেড়েক সদস্য রং-বেরঙের পোশাকে আর নারীরা খোঁপায় ফুল গুঁজে যোগ দেন এই উৎসবে। তাই শেখ মুহম্মদ বেলাল তার শুভেচ্ছা বক্তব্যই শুরুই করলেন রসিকতার মাধ্যমে, বাইরে আজ ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, বসন্তে আজ মেয়েদের খোঁপায় ভালোই ফুল ফুটেছে। তার ভাষায় বসন্ত মানে নতুন আশা, বসন্ত মানে ভালোবাসা, বসন্ত মানে নতুনের আগমন। তাই তার মতে, যিনি বসন্তকে পঞ্জিকার পাতায় আবদ্ধ রাখেন তার বসন্ত আসে বছরে মোটে একবার, কিন্তু যারা উদ্যমী তাদের মনে বসন্ত আসে বারবার।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেপালের সারিতাদিলরুবা নাসরিন পেশায় একজন চিকিৎসক ও গবেষক। কিন্তু সেই পরিচয় ছাপিয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে তার বড় পরিচয় তিনি একজন শিল্পী। বসন্ত তাকে মনে করিয়ে দেয় দেশের মাটিকে, যেখানে তিনি ছোট থেকে বড় হয়েছেন। বসন্ত মানে তার কাছে গান, কবিতা, মেলা আর বায়োস্কোপ। তাই তিনি গাইলেন ‘তোমার বাড়ি রঙের মেলা, দেখেছিলাম বায়োস্কোপ’।
মাহমুদ হাসান আর জেবুন নাহার জেমির সহজ সাবলীল উপস্থাপনায় বসন্ত উৎসব যেন আসলেই হয়ে উঠল একটি রঙের মেলা। সমবেত কণ্ঠে ‘আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোটে কত পাখি গায়’-এর সুরে বসন্তের ফুল ফোটাল ফারজানা, শারানা, অপর্ণা, দুলাল ও আফরিনরা। তারপর ভরতনাট্যমের মাধ্যমে মেঘলা, তৃষা আর শ্রী বুঝিয়ে দিল দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তারা আসলে দেশমাতৃকার কত কাছে। ছোট্টমণি আরিবা, জুনায়রা আর রায়া গুটি গুটি পায়ে নৃত্যের মাধ্যমে রঙে রঙে লাগাল রঙিন নেশা। তারপর অবন্তিকা সাহা তার মায়ের হারমোনিয়ামের সুরে তার মাকেই বলল, ‘আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকব’।
ফারজানা ফিরোজ হাসন রাজার সুরে সুরে নিশা লাগাল দর্শক শ্রোতাদের চোখে মুখে। কেয়া করের নৃত্য মুগ্ধ করল সবাইকে। এত কিছুর মাঝেও আকর্ষণীয় ছিল সদ্য বোল ফোঁটা শিশু আরিনা ও তার বন্ধুদের সমবেত কণ্ঠে ‘ফুলে ফুলে ঢোলে ঢোলে, বহে কিবা মৃদু বায়’। নেপালি মেয়ে সারিতা নাচল বাংলা গান ‘ওরে ও ননদি আর দু মুঠো চাল ঢেলে দে পানিতে’-এর সুরে। তরুন শিল্পী নাহিদের ‘লাল ফিতা সাদা মোজা স্কুল ইউনিফর্ম’ সকলকে নিয়ে গেল কলেজজীবনে; ভোগাল নস্টালজিয়ায়।
দর্শক-শ্রোতাদের একাংশসবশেষে আকর্ষণীয় কৌতুক নাট্য ‘পাগল তোর জন্য রে’ এই যান্ত্রিক জীবনে সকলকে সুযোগ করে দেয় একটু প্রাণ খুলে হাসার। বাঙালিত্বের বাদ গেল না কিছুই। অনুষ্ঠান শেষে পিঠা-পুলির স্বাদে অনেকেই ভুলতে বসেছিলেন যে তারা আছেন বিদেশের মাটিতে।
শেখ মুহম্মদ বেলাল যেমন তার বক্তব্যে বললেন, শীতের দেশে কর্মসূত্রে আগমনের আগে তিনি বসন্তের মর্ম অতটা বুঝতেন না। আসলে নেদারল্যান্ডসের মতো শীত প্রধান দেশে অভিবাসী বাঙালি মাত্রই এখানে আসার পরই অনুধাবন করেন শীতের শেষে বসন্তের আগমন কতটা সুখকর। সেই বসন্তের আগমনকে তাই হাসি–গানে বরণ করার উদ্দেশ্যেই ছিল সীমানা পেরিয়ের এই আয়োজন।
২০০৯ সালে কয়েকজন সংস্কৃতিমনা বাঙালির হাত ধরে যে সংগঠনটির জন্ম, হাঁটি হাঁটি পা পা করে সেই সীমানা পেরিয়ে আজ নবম বছরে পদার্পণ করল। তাদের আছে উদ্যম, আছে উদ্যোগ; আছে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট বাঙালি সংস্কৃতির চেতনাকে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়। তাদের অভিনন্দন, তাদের অভিবাদন।
রক্তকরবী: হল্যান্ডপ্রবাসী।
areefta.zahrah@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন