দূর পরবাস     সংবাদ

পৃথিবীর সবচেয়ে স্বনির্ভর শিশু

নিহাদ আদনান তাইয়ান, টোকিও (জাপান) থেকে | ১৬ মার্চ ২০১৭, ১৬:১৮

 

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীতশৈশবে কিংবা কৈশোরে মনে গেঁথে যাওয়া বিশ্বাস কিংবা গড়ে ওঠা অভ্যাস থেকে মানুষ কিন্তু খুব সহজে বের হতে পারে না। আর এই শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় অংশ মানুষ কাটিয়ে দেয় তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাই নিঃসন্দেহে অধিকাংশ মানুষ তার সমগ্র জীবনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমবেশি বহন করে। বিশেষ করে তার স্কুলের।

সেই প্রিলিমিনারি স্টেজ থেকেই কিছু কমন টপিক আমরা সবাই চর্চা করে আসি। যেমন সততা, নিয়মানুবর্তিতা, শিষ্টাচার, শ্রমের মর্যাদা, অধ্যবসায়, এইম ইন লাইফ, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব, দেশপ্রেম ও সাম্যের সমাজসহ আরও অনেক কিছু। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিষয়গুলোর চর্চা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। অথচ এই চর্চা তো যত না খাতা কলমের বিষয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের বিষয় যেমনটা জাপানের স্কুলগুলো করে থাকে।
এখানে একটা প্রসঙ্গ আসতেই পারে, জাপান আর আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তো আর এক নয়। কাজেই যেটা ওদের সম্ভব, আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু জাপান তো আর একদিনে এখানে আসেনি। দুই শ বছরেরও বেশি সময় এরা সমগ্র পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ। তাই, জাপানি কোনো অধ্যাপককে কোনো বিষয়ের জটিলতা বা দুর্বোধ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলেই প্রায়ই একটি প্রবাদবাক্যের রেফারেন্স টেনে আনেন—‘Thousand mile প্রতীকী ছবি। সংগৃহীতjourney begins with one step’.
যা হোক, জাপানের শিশুদের নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে স্বনির্ভর শিশু বলা হয়। আর সেই শিক্ষা শুরু হয় স্কুল থেকেই। জাপানি স্কুলগুলো নিয়ে একটু স্টাডি করে নিচের বিষয়গুলো খুঁজে পেলাম। আর কেন সবচেয়ে স্বনির্ভর শিশু বলা হয় সেই উত্তরও সহজে বুঝতে পারলাম।
১. ছোটবেলা থেকেই কমবেশি প্রতিটি শিশু একাকী স্কুলে যায়। হয়তো পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে চড়ে অথবা লোকাল মেট্রো ব্যবহার করে। প্রথম দিকে অনেক সময় হারিয়েও নাকি যায়। পরে সে নিজেই খুঁজে খুঁজে বের করে নেয় তার গন্তব্য। এতে নাকি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার একটা ভালো প্র্যাকটিস হয়ে যায়। এটা আসলে আমাদের দেশে কল্পনাতীত। কিন্তু একটা দেশ কতটা নিরাপদ হলে এই প্র্যাকটিস করতে পারে, এটা ভেবেই পুলকিত হতে হয়।
২. আমার বাসা থেকে ২ মিনিটের পথেই একটি স্কুল আছে। বাচ্চাগুলোকে দেখি কাঁধে ব্যাগ, একহাতে টিফিন বক্স, আরেক হাতে ছাতা কিংবা আরও অনেক কিছু নিয়ে একা একা হেঁটে যেতে। একজনার জিনিস আরেকজন যে বহন করতে পারে এটা নাকি এরা কল্পনাও করতে পারে না।
৩. জাপানের স্কুলগুলোতে কোনো পরিচ্ছন্নতা কর্মী নাকি সাধারণত রাখা হয় না। স্কুল কম্পাউন্ড পরিষ্কার, এমনকি স্কুলের টয়লেট পরিষ্কার সবই নাকি স্টুডেন্টরাই করে থাকে। পালাক্রমে সবাইকে এই কাজ করতে হয়। এরা নাকি খুবই উপভোগ করে এই সময়টা। সব ক্লাসমেটরা মিলে মজা করতে করতে এই কাজ করে! অনেকটা ব্রেক টাইম হিসেবে নেয়।
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত৪. স্কুলের লাঞ্চ সবাই একসঙ্গে বসে খেতে হয়। তাও আবার স্কুল থেকে সরবরাহ করা একই মেন্যু। এমনকি স্কুলের শিক্ষক, স্টাফ সবার জন্য একই মেন্যু। পারস্পরিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার প্রয়াস থেকেই এই উদ্যোগ। এ ছাড়া একই মেন্যু দেওয়া হয় যাতে কোনোভাবেই কোনো প্রকার বৈষম্য ফুটে না ওঠে (আর আমাদের স্কুলে হয়তো ক্লাস ফাইভের কোনো বাচ্চার টিফিন হয় বিরিয়ানি, আর তার পাশে বসা আরেকটি বাচ্চার টিফিন হয় এক পিস রুটি বা ২টি বিস্কুট), লাঞ্চ সার্ভ করার বিষয়টিও স্টুডেন্টরাই করে থাকে পালাক্রমে। এ ছাড়া হেলদি ফুড বা ব্যালেন্স ডায়েটের বিষয়গুলো নিয়ে ছোটবেলা থেকেই সচেতন করা হয়। কোনো ধরনের জাঙ্ক ফুড স্কুলের মেন্যুতে রাখা হয় না।
৫. স্কুলগুলোতে ওয়ার্কশপ, ক্লাব অ্যাকটিভিটিস ও স্পোর্টস এগুলো খুব গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। পরিপূর্ণ গেটআপ ছাড়া কোনো অ্যাকভিটিসেই অংশ নেওয়া যায় না। যেমন বেসবল টিমের অংশ হলে বেসবলের সব নিয়ম মেনে বেসবল খেলার পরিপূর্ণ গেটআপেই আসতে হবে। নিয়ম যথাযথ মেনে খেলা হবে। কোচ থাকবে, টিম ম্যানেজমেন্ট থাকবে ইত্যাদি। ফলে যে কোনো বিষয়ে অটোমেটিক একটা দায়িত্ববোধ চলে আসে।
৬. একটা লেভেল পর্যন্ত এক্সামের গ্রেডের চেয়ে অন্যান্য বিষয়গুলো যেমন আচার-আচরণ, শিষ্টাচার, কমিটমেন্ট, শৃঙ্খলাবোধ, জীব প্রেম এই সব বিষয়ে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়। আবার পড়ালেখার প্রতিও বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়। যেমন জাপানে শনি ও রোববার সাপ্তাহিক ছুটি। অনেক স্কুলেই নাকি বাচ্চাদের এভাবে উৎসাহিত করা হয় যে মাসের ৪–৫টি শনিবারের মধ্যে কমপক্ষে একটি শনিবার তাদের কার্টুন না দেখে স্কুলে এসে ম্যাথ প্র্যাকটিস করা উচিত। কমবেশি সবাই নাকি এটি মেনেও চলে।
৭. কোনো বাচ্চাকেই এখন পর্যন্ত বাবা-মার কোলে চড়তে দেখলাম না। যারা হাঁটতেই শেখেনি তাদের জন্য বেবি স্ট্রলার। আর যারা একবার হাঁটতে শিখে গেছে তাদের আর কোনো কথা নাই। হাঁটতেই হবে। তা যত দূরই হোক না কেন কিংবা বড়জোর সাইকেল।
জাপানি এক ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, এত অল্প বয়সের একটা বাচ্চাকে এভাবে একা একা চলতে দিতে ভয় করে কিনা। উত্তরে তিনি একটি জাপানি প্রবাদবাক্য মনে করিয়ে দিয়েছিলেন—‘Send the beloved child on a journey.’
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ শহর নাকি জাপানের রাজধানী টোকিও। কাজেই, জাপানে এই ধরনের প্রবাদ-প্রবচন থাকবে এটাই স্বাভাবিক, প্রবাদ-প্রবচনগুলো তো সমাজেরই প্রতিফলক।

নিহাদ আদনান তাইয়ান: অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর সপ্তর (টিআর), বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা। বর্তমানে প্রেষণে জাপান সরকারের স্কলারশিপে মেইজি ইউনিভার্সিটি, টোকিওতে অধ্যয়নরত।

পাঠকের মন্তব্য (৪)

  • Masudur

    Masudur

    আপনি যেমন বিশ্বের নিরাপদ শহর দেখে আসতেছেন, নিজের শহরকেও তেমনি নিরাপদ করে তুলতে অবধান রাখবেন আশাকরি।
     
  • Aasmi

    Aasmi

    জাপানে তো মানতি দিতে হয় না। সুতরাং উনার শিক্ষা বৃথা যাবে বলাই বাহুল্য। তবুও ধন্যবাদ এমন একটি রূপকথা রাজ্যের বর্ণনা দেবার জন্য।
     
  • MOHIBUL ALAM

    MOHIBUL ALAM

    লেখক এবং আমাদের সবার জন্য ‘Thousand mile journey begins with one step’
     
  • khokamonychakma

    khokamonychakma

    এখানে যদি তা প্রচলন করা হয় তা হলে মা-বাবাই বলবে ‘‘কি সাহস আমার বাচ্চাকে দিয়ে টয়লেট পরিস্কার করাবেন’’
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন