বাংলাদেশ     সংবাদ

প্রসঙ্গ হেফাজত

সরকারের কৌশলে নাখোশ শরিকেরা

আনোয়ার হোসেন | ২১ মার্চ ২০১৭, ০২:২৪  

হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মীয় গোষ্ঠীর দাবির ব্যাপারে সরকার কিছুটা নমনীয় বলে মনে করছে ক্ষমতাসীনদের জোট ১৪ দলের শরিকেরা। এ কারণে শরিক দলগুলো আওয়ামী লীগের ওপর কিছুটা নাখোশ। তারা মনে করছে, সরকারের এ অবস্থান হেফাজতকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।
অন্যদিকে সরকার মনে করছে, হেফাজতসহ ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড তাদের নজরের মধ্যে আছে। তাদের নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।
সরকার এবং ১৪ দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, সরকার হেফাজতে
ইসলামসহ কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীকে যোগাযোগের মধ্যে রেখে নিষ্ক্রিয় করে রাখার কৌশল নিয়ে চলছে।
১৪ দলের শরিক দলগুলোর অনেক নেতা সরকারের এ যোগাযোগটাকে ভালোভাবে দেখছেন না। তাঁরা মনে করছেন, এটি সরকারের ভুল কৌশল। কারণ, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল থেকে হেফাজতকে সরিয়ে দেওয়ার পর এই গোষ্ঠীটি দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্য ধর্মীয় সংগঠনগুলোও সরকারের বিরোধিতা করার বিষয়ে কিছুটা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু হেফাজতের চাওয়া মেনে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনার কারণে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে থাকা ভাস্কর্য ভাঙার আন্দোলনের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে হেফাজতে ইসলাম। একই দাবিতে সোচ্চার হয়েছে সরকার-সমর্থক কিছু ধর্মীয় সংগঠনও।
এ বিষয়ে ১৪ দলের ছয়জন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা সবাই বলেছেন, হেফাজত ভোটে কোনো কাজে আসবে না। এর কোনো একক নেতৃত্ব নেই। ফলে যে কেউ চাইলে তাদের ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। তাই সরকার যতই নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলুক না কেন, ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
এর আগে গত বছর পাঠ্যবইয়ে ১৭টি বিষয় সংযোজন ও ১২টি বিষয় বাতিলের সুনির্দিষ্ট দাবি তুলেছিল হেফাজত। চলতি বছর নতুন পাঠ্যবইয়ে কিছু পরিবর্তন হয়েছে, যা হেফাজতের দাবির সঙ্গে মিলে গেছে। হেফাজত এ জন্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদও জানিয়েছে।
জানতে চাইলে ১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, হেফাজতের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন একধরনের আপস। এ জন্যই হেফাজত এখন ভাস্কর্য অপসারণের দাবি তুলছে। এতে সফল হলে তারা অপরাজেয় বাংলা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতির বিরুদ্ধে মাঠে নামবে। তাদের এ তৎপরতা অঙ্কুরেই বিনাশ করতে হবে।
১৪ দলের একটি সূত্র জানায়, জোটের বৈঠকে হেফাজতসহ ধর্মীয় গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধভাবে কোনো সিদ্ধান্ত বা অবস্থান পরিষ্কার করে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতারা এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি।
জানতে চাইলে ১৪ দলের শরিক জাসদের একাংশের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, হেফাজতসহ ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে আপন ভাবলে ভুল হবে। তাদের ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
জোটের আরেক শরিক তরীকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, হেফাজতের কথায় পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন ও ভাস্কর্য অপসারণের আন্দোলনে সরকারের নমনীয় ভাব প্রকাশ পেয়েছে। তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা হবে আত্মঘাতী।
সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, হেফাজতের ভেতরে কারও কারও রাজনৈতিক অভিলাষ আছে। নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের জানান দেওয়ার চেষ্টা আছে। সরকারবিরোধী অন্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো তাদের ব্যবহার করতে চাইবে। সে ধরনের তৎপরতাও আছে। তবে তারা মাঠে নেমে যাবে, এমন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন হয়ে থাকলে তা দুঃখজনক। আর সুপ্রিম কোর্টের আঙিনার ভাস্কর্যের সঙ্গে ন্যায়বিচারের ঐতিহাসিক ব্যাপার জড়িয়ে আছে। ধর্মীয় গোষ্ঠী এটাকে ‘মূর্তি’ বলে যে দৃষ্টিকোণ প্রকাশ করছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যদি ধর্মীয় গোষ্ঠী সহিংস হওয়ার চেষ্টা করে, সরকার নিশ্চয় ব্যবস্থা নেবে।

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন