বাংলাদেশ     সংবাদ

কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু দুর্নীতি চেষ্টার মামলা

পদ্ধতিগত দুর্বলতায় তথ্য আমলে নেননি আদালত

নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০২:১৫  

ব্যক্তিগত যোগাযোগের নথি জব্দ করার পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে কানাডার আদালতে মামলাটি বাতিল করা হয়। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) আদালতে প্রমাণ হিসেবে আড়িপাতা টেলিফোন রেকর্ড জমা দিয়েছিল। এসব রেকর্ড আমলে নেননি আদালত। পরে মামলাটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় এসএনসি-লাভালিনের তিন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেন আদালত।
মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী ভূঁইয়া।
পদ্মা সেতুর একটি কাজ পেতে দুর্নীতির চেষ্টার অভিযোগ প্রমাণ করতে কানাডা পুলিশ আদালতে জব্দ করা টেলিফোন রেকর্ড জমা দিয়েছিল। কিন্তু যথেষ্ট আইনি ভিত্তি না থাকায় আদালতে উপস্থাপিত জব্দ করা রেকর্ডগুলো গ্রহণ করেননি অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারক জে নর্ডেইমার। বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে তা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন তিনি। গত ৬ জানুয়ারি এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ওই দিনের বিচার কার্যক্রমের শুরুতেই জে নর্ডেইমার বলেন, এ ধরনের রেকর্ড তিনি শুনবেন না।
শুরু থেকেই এই মামলার বিচারিক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। পরে ১০ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী দিনের কার্যক্রমে আদালত থেকে জানতে চাওয়া হয় কানাডা পুলিশের কাছে আদালতে জমা দেওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের বাইরে নতুন সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে কি না। আরসিএমপি জানায়, তাদের কাছে নেই। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খালাস দেন আদালত। এর ফলে অভিযোগের মূল বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই মামলাটি শেষ হয়ে যায়। ওই দিন এ মামলা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়। ফলে ২৭ পাতার আদেশের কপি এখন প্রকাশ করা হয়েছে।
যে কারণে আমলে নেননি আদালত
অভিযোগ ছিল, পদ্মা সেতু তদারকির কাজ এসএনসি-লাভালিনকে পাইয়ে দিতে দুর্নীতির চেষ্টা হচ্ছে। এতে সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা ও এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তারা জড়িত। ওই সময় আরসিএমপি ২০১১ সালে এই খবর জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সি (আইএনটি) বিভাগ।
রুল বাতিলের আদেশটিতে মামলার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বিবরণ অনুযায়ী, আইএনটির তদন্তকারী পল হেইন্স কানাডা পুলিশকে জানান, চারজন আভাস দানকারীর কাছ থেকে এ খবর পেয়েছেন। তাঁরা ই-মেইলে এ খবর বিশ্বব্যাংককে জানিয়েছেন। প্রথম ও তৃতীয় জনকে পল হেইন্স চেনেন না; কখনো দেখা হয়নি। হেইন্স দ্বিতীয় জনকে চেনেন। কিন্তু দ্বিতীয় জনের অনুরোধের ভিত্তিতে কানাডা পুলিশের কাছে পরিচয় গোপন করেছেন তিনি। আর চতুর্থ জন যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা মামলার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
এরপর কানাডা পুলিশ প্রথম ও তৃতীয় জনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। অন্যদিকে দুই নম্বর আভাস দানকারীর সঙ্গে শুধু টেলিফোনে কথা বলেছে। এমনকি যেসব অভিযোগ এসেছে, তা নিয়ে কানাডা পুলিশ নিজ উদ্যোগে কোনো তদন্ত করেনি। আবার আভাস দানকারীরা নিজেরাই বলেছেন, এসব অভিযোগ তাঁরা (আভাস দানকারী) শুনেছেন, এ নিয়ে অনেক গুজব আছে।
আদালতের নথিতে বিশ্বব্যাংকে পাঠানো এক নম্বর আভাস দানকারীর ই-মেইলের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তদারকির কাজের দরপত্রের মূল্যায়ন-প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতির অনেক গুজব আমরা শুনছি। সর্বশেষ গুজবটির তথ্য-প্রমাণাদি আছে, তবে আমরা তা দেখিনি। যদি এটা সত্য হয়, তবে দরপত্রের মূল্যায়ন কমিটি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি।’ এ বিষয়ে আদালত বলেছেন, এ অভিযোগটি করা হয়েছে গুজবের ওপর ভিত্তি করে।
আদালত আরও বলেছেন, এক নম্বর আভাস দানকারী সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশ্বব্যাংককে কিছু লোকের নাম দিয়েছিলেন। চাইলে বিশ্বব্যাংক ওই সব ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারত। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ওই সব ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্যে কানাডার পুলিশ বলেছে, এক নম্বর আভাস দানকারী যদি দরপত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অসন্তুষ্ট হতেন, তবে তিনি দরপত্রে প্রথম স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানের দিকেই অভিযোগ তুলতেন। তাই এসএনসি-লাভালিনের সম্মান হানি করে দুই নম্বর আভাস দানকারীর মতো তাঁর কোনো লাভ নেই। তবে আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গুজব ও শোনা কথার ভিত্তিতে এনেছেন ওই আভাস দানকারী। আবার এই দ্বিতীয় আভাস দানকারী নিজেও কাজ পেতে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার কথা নিজেই উল্লেখ করেছেন। এ অবস্থায় তাঁর দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আদালত।
আদালতের নথি থেকে আরও জানা যায়, দ্বিতীয় আভাস দানকারীর সঙ্গে কানাডা পুলিশ শুধু দুবার টেলিফোনে কথা বলেছে। কিন্তু ওই আভাস দানকারীর অতীত ইতিহাসসহ বিস্তারিত আর কোনো খোঁজ নেয়নি কানাডা পুলিশ। দুই নম্বর আভাস দানকারী বিশ্বব্যাংককে তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য কিছু লোক বা সূত্রের পরিচয় জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও কানাডা পুলিশ কেউই তাঁদের (ওই সব লোক বা সূত্র) সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এমন প্রমাণ পাননি কানাডার আদালত।
কানাডার আদালত পর্যবেক্ষণ হলো, মামলায় এমন কিছু তথ্যের ওপর বাদী নির্ভর করেছেন, যা পর্যাপ্ত নয়। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, আভাস দানকারীদের তথ্য অনুযায়ী, দরপত্রের মূল্যায়ন-প্রক্রিয়ায় ছলচাতুরী করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারি কর্মকর্তারা প্রভাব খাটানোয় মূল্যায়ন কমিটি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ তদারকির জন্য ৫ কোটি ডলারের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর ওই দরপত্রে অংশ নেওয়া সংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কারিগরি যোগ্যতার ক্রম প্রকাশ করা হয়। এতে প্রথম হয় এইচপিআর নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া এসএনসি-লাভালিন দ্বিতীয়, এইসিওএম তৃতীয়, হ্যালক্রো চতুর্থ এবং ওরিয়েন্টাল পঞ্চম স্থান লাভ করে। এরপর ২০১১ সালের ২৮ মার্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রস্তাবের ক্রম প্রকাশ করা হয়। সেখানে হ্যালক্রো প্রথম হয়। এসএনসি-লাভালিন আগের মতোই দ্বিতীয় স্থানে থাকে। তবে এইচপিআর তৃতীয় স্থানে চলে যায়।
এ ছাড়া এসএনসি-লাভালিনের কার্যালয়ে গিয়ে কানাডা পুলিশের সাক্ষ্য-প্রমাণ জব্দ করার প্রক্রিয়া নিয়ে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, আভাস দানকারীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে শুধু ওই সব সাক্ষ্য-প্রমাণ জব্দ করা হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য (১৪)

  • Abdul Haque

    Abdul Haque

    কানাদার আদালত ঠিক কাজটিই করেছে।
     
    • Roni Choudhury

      Roni Choudhury

      যারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কথা প্রচার করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আশা করেছিল তারাই মূলতঃ পরাজিত হয়েছে এবং জাতির কাছে ছোট হয়েছে। এখন এদের আইনের আওতায় আনা উচিৎ। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ উদ্দোগে পদ্মা সেতু প্রকল্প হাতে নিয়ে প্রমান করেছেন বাংলাদেশ আর নির্ভরশীল দেশ নেই। বাংলাদেশ অনেক কিছু পারে এবং পারবে।
        ১১
    • RUPOM

      RUPOM

      "কানাডার আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গুজব ও শোনা কথার ভিত্তিতে এনেছেন ওই আভাস দানকারী। আবার এই দ্বিতীয় আভাস দানকারী নিজেও কাজ পেতে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার কথা নিজেই উল্লেখ করেছেন। এ অবস্থায় তাঁর দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আদালত।" ----- এর পরে আর কোন কথা থাকেনা।
       
  • Shapnik Roy

    Shapnik Roy

    আসলে কানাডা সরকারী আইনজীবিরা এই "কেসটা" কে "ফেলানী" কেস হিসাবে আদালতে দাখিল করে সব গুলিয়ে ফেলেছেন। কারন তাদের কাছে আদালত আরো কাগজ-পএ চেয়েছিলো, যা তারা দিতে না পেরে অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের সরকারী দলের কিছু লোকের তাতে উছছসিত হওয়ার কোন কারন নাই। কারন আদালতের কাছে এরা Necessary Document for felony offense দাখিল না করতে পারলেও World Bank এর নিয়ম বা আইন অনুসারে ঐগুলো Attempt to Corruption or Corruption হিসাবে বিবেচিতো। তাই Padma Bridge যে করপাশান বা দুরনীতি হয় নাই , তা কেও বলতে পারবে না।
      ১৫
    • hidden

      What an expert. They should have hired you as their lawyer. There was no evidence, because all those claims were made up Hillary's men installed in WB. And all those phone calls were fake calls trying to make it look like there was a conversation going on. That is why the WB and Canadian police never cared for asking those informers because it would be embarassing.
        ১২
    • RUPOM

      RUPOM

      এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গুজব ও শোনা কথার ভিত্তিতে এনেছিল এবং উপস্থিত তথ্যও আদালতের নিকট বিশ্বাস যোগ্য হয়নি। ভুয়া ও কাল্পনিক মামলা বাতিল হওয়ায় আমাদের দেশের সন্মান বৃদ্ধি পেয়েছে।
       
    • Dipak Kumar Biswas

      Dipak Kumar Biswas

      World Bank কি ধোয়া তুলসি পাতা ?
       
  • abir

    abir

    'পদ্ধতিগত দুর্বলতায় তথ্য আমলে নেননি আদালত' পদ্ধতিগত দুর্বলতা কি প্রমাণ করে বাস্তবে কোন দূর্নীতি হয়নি ?
      ১২
  • kazi ahmed

    kazi ahmed

    "র্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় এসএনসি-লাভালিনের তিন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেন আদালত" , কথা সত্য সাক্ষি দূর্বল!
     
  • Nayan

    Nayan

    Muddy water. Delay the project. Then Hillary comes, then take away Padma. Unfortunately, Trump came.
     
  • Samir Samadder

    Samir Samadder

    No corruption committed at all but seems there was an attempt to commit corruption among the parties.
     
  • Abdul Hannan Paul

    Abdul Hannan Paul

    ঘটনা সত্য, সাক্ষী দুর্বল।
     
  • কাজল চৌধুরী

    কাজল চৌধুরী

    মিথ্যা অভিযোগ না উঠলে এত দিনে আমরা পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করতে পারতাম।
      ১০
  • mohammed ullah

    mohammed ullah

    Continuously 5 times Bangladesh was no 1 corrupted country of the world it was right or wrong???? If right, at that time what was the role of World Bank ?? World Bank no approved any loan for Bangladesh at that time??????? the nasty politics like 1971.Remember 1971 every thing will clear.
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন