শিল্প ও সাহিত্য     সংবাদ

বইপত্র

নানা ধারার গণতন্ত্র ও বাংলাদেশ

খন্দকার সাখাওয়াত আলী | ১৭ মার্চ ২০১৭, ০০:০৯  

প্রচ্ছদ: অশোক কর্মকারএবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত প্রবন্ধের বইগুলোর মধ্যে বদরুল আলম খানের গণতন্ত্রের বিশ্বরূপ ও বাংলাদেশ বইটিকে প্রথমা প্রকাশনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা বলে মনে হয়েছে। বদরুল আলম খান পেশায় শিক্ষক ও সমাজতাত্ত্বিক। বর্তমানে ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দেশে ১৯৮৩ সালে প্রথমে তিনি যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ অব্দি পড়িয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সমসাময়িক বিশ্ব ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বইটি বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। বিগত তিন দশকের বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালকে একটি ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’ ধরে আলোচ্য বইয়ে গণতন্ত্র-সম্পর্কিত মূল প্রশ্ন ও তার উত্তর খোঁজা হয়েছে। লেখকের ভাষ্যমতে, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের নতুন উত্থান ঘটে। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব কটি গণতন্ত্রই কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে। রাষ্ট্র ও অঞ্চলভেদে গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জগুলো ভিন্নতর।

এই বইয়ের লেখক ড. আলমের প্রধান অবদান হলো, তিনি বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের নানা প্রবণতা তুলে ধরার পাশাপাশি সেই বিশ্ববাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা মিলিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন। গণতন্ত্রের বিশ্বরূপ ও বাংলাদেশ-এর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালেই আমরা এর গভীরতার দিকটি বুঝতে পারব।

গণতন্ত্রের বিশ্বরূপ ও বাংলাদেশ—বদরুল আলম খান, প্রচ্ছদ: অশোক কর্মকার, প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২০৮ পৃষ্ঠা, দাম: ৪০০ টাকা।

লেখক ভূমিকা বাদে পাঁচটি অধ্যায়ে তাঁর চিন্তা ও বক্তব্যকে বিন্যস্ত করেছেন। ভূমিকাতে তিনি গণতন্ত্রের ‘ডিলেমা’, তাত্ত্বিক কাঠামো ও দুটি ‘থিসিস’ তুলে ধরেছেন। চীন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন, সত্যিকার গণতন্ত্র কোনটি? সুশাসনহীন গণতন্ত্র নাকি অগণতান্ত্রিক সুশাসন—কোনটি আমাদের জন্য উপযোগী? এ বিষয়ে যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে লেখক তুলে ধরেছেন তাঁর বক্তব্য ও বিশ্লেষণ। আর তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে তিনি সামনে এনেছেন দুটি ‘থিসিস’। প্রথমটি হলো আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ ধরনের দেশগুলোর চরিত্র হচ্ছে উত্তরণকালীন। দ্বিতীয় ‘থিসিস’: বাংলাদেশে গণতন্ত্র-সংক্রান্ত যেসব আলোচনা হয়, তা মূলত বাগাড়ম্বর বা স্লোগানধর্মী। উপরন্তু আমাদের রাজনীতির আত্মপরিচয়গত বিরোধ-ধারণার সমাজতাত্ত্বিক একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টাও তিনি করেছেন। লেখকের এই প্রচেষ্টার বিস্তৃত উদ্যোগটি আমরা দেখি প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত তাঁর সংঘাতময় বাংলাদেশ (২০১৫) গ্রন্থে।
আলোচ্য বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে গণতন্ত্রের নানা দিক তুলে ধরেছেন লেখক। এই অধ্যায়ে তিনি গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, পরিমাপের সূচকসমূহ তুলে ধরার পাশাপাশি গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ জটিলতা, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে যে গণতন্ত্রের জোয়ার বয়েছিল, ঢেউ লেগেছিল—এসবের মূল্যায়ন করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন বইটির প্রথম ‘থিসিস’ নিয়ে। উত্তরণকালীন গণতন্ত্রের বিষয়টি আলাপ করতে গিয়ে নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে গণতন্ত্রের চেহারা কী দাঁড়াচ্ছে, সে আলোচনায় গণতন্ত্রের অন্যান্য প্রবণতা ও ধরন তুলে ধরেছেন বদরুল। নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্র, গণতন্ত্রবিরোধী বৈশ্বিক প্রবণতা, সর্বোপরি ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের স্বরূপ নিয়েও বর্তমান অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
বইটির বাকি তিন অধ্যায়জুড়ে আছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা। তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়ণে আর্থসামাজিক পূর্বশর্তগুলোর বিবেচনায় এবং গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা ও উদারতার ঘাটতি বিষয়ে। মোদ্দা কথা, বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়ণের আসল চেহারা কেমন, সে দিকগুলো এখানে তুলে ধরেছেন লেখক। চতুর্থ অধ্যায়ে আর্থসামাজিক পূর্বশর্তগুলোর ভিত্তিতে দেশে গণতন্ত্রায়ণে জনগণের ভূমিকা কী হওয়া দরকার—আছে সেই আলোচনা। অধিকন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক ‘এলিট’দের ব্যর্থতার দিকগুলো নানা উদাহরণ, বিশ্লেষণসহ তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র কোন পথে হাঁটছে, তার অনুসন্ধান ও বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান খোঁজার চেষ্টা রয়েছে পঞ্চম অধ্যায়ে। এ অধ্যায়ে লেখক যেমন বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়ণের সংকট চিহ্নিত করতে গিয়ে সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিহীনতা নিয়ে কথা বলেছেন, তেমনি বইটির শক্তির দিক প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা আছে এখানে—রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে জাতীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে অনৈক্য, বাঙালি জাতিবিরোধী ইসলামি শক্তি, রাজনৈতিক দলের ভেতরে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ভূমিকার একটি বিশ্লেষণাত্মক উদ্যোগই গণতন্ত্রের বিশ্বরূপ ও বাংলাদেশ শিরোনামের বইয়ের শক্তির দিক। এসব কারণে বইটি যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের পাঠ্য।
বদরুল আলমকে তাঁর এই পরিশ্রমী উদ্যোগের জন্য অভিনন্দন।

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন