শিল্প ও সাহিত্য     সংবাদ

বাংলাদেশের একটি হারিয়ে যাওয়া ভাষা

সৌরভ সিকদার | ১০ মার্চ ২০১৭, ০২:১৫  

রেংমিটচা ভাষার আনুমানিক ভাষিক অঞ্চল (ব্রাউন্স ও লফলার থেকে গৃহীত, ১৯৮৬)দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালে ১৯৫৫-৫৬ সালে জার্মান নৃবিজ্ঞানী লরেন্স লফলার (১৯৩০) পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন। তিনি মূলত ম্রো সম্প্রদায়ের গো-হত্যা উৎসব (সিয়া-সাত পল্লাই) নিয়ে গবেষণার কাজে বাংলাদেশে আসেন। লফলার পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠী ও তাদের সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর মৃত্যুর (২০১৩) আগে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় অ্যাথনোগ্রাফিকস নোটস অন ম্রো অ্যান্ড খুমি অব চিটাগাং অ্যান্ড আরাকান হিল-ট্র্যাকটস (২০১২)। ভাষা সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ছিল লফলারের এবং ভাষাবিজ্ঞানে তিনি প্রশিক্ষিতও ছিলেন। তাই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষাবিষয়ক বেশ চমৎকার কিছু লেখা লিখেছিলেন তিনি। লফলারের গবেষণা অঞ্চলের মধ্যে ম্রো-অধ্যুষিত লামা ও আলিকদম অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে তিনি যখন মাঠপর্যায়ে উপাত্ত সংগ্রহের কাজ করছিলেন, হঠাৎই লক্ষ্য করলেন ম্রোদের ভেতরে কিছু মানুষ রয়েছে, যাদের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক অভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা কথা বলে একটি আলাদা ভাষায়। এই ভাষার নাম রেংমিটচা।
এরপর একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন লফলার; এবং আশির দশকে চিত্রগ্রাহক ক্লাউস-ডিটার ব্রাউন্সের সঙ্গে প্রকাশিত এক চিত্রগ্রন্থের লিখিত অংশে আবারও তিনি উল্লেখ করেন রেংমিটচা ভাষার কথা। তবে পঞ্চাশের দশকে এ ভাষার কতজন ভাষী ছিল, সেটি আর বলতে করতে পারেননি তিনি। তবে তাঁর দ্বিতীয় বর্ণনায় এ ভাষার মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমান করেন তিনি।

রেংমিটচার সন্ধানে
১৯৯৯ সালে আমেরিকান ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড পিটারসন পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি-চিন ভাষাগুলোর ওপর প্রাথমিক গবেষণার কাজ করতে ফেলোশিপ নিয়ে প্রথম বাংলাদেশে আসেন। এরপর থেকে নিয়মিত বাংলাদেশে আসতে থাকেন তিনি। প্রথমে জার্মানির লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্সপাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যানথ্রোপোলজির পোস্ট ডক্টরেট গবেষক হিসেবে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্মাথ কলেজে ভাষাবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর। লোফলারের পর রেংমিটচা ভাষা নিয়ে আর কেউ গবেষণা করেননি। এমনকি প্রায় সবাই ভুলেই গিয়েছিলেন যে এই নামের একটি ভাষা আছে বাংলাদেশে। কেউ কেউ ভেবেছিলেন ভাষাটি হারিয়ে গেছে। এরপর ২০০৯ সালে যখন ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড পিটারসন বান্দরবান আসেন এবং ম্রো ভাষা নিয়ে একজন ভাষা-পরামর্শকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন, তখন তিনি জানতে পারেন, ম্রোদের মধ্যে কিছু মানুষ অন্য আরেকটি ভাষায় কথা বলে। সেই লোকগুলো বসবাস করে আলিকদমে; আর তাদের ভাষাটি সম্ভবত রেংমিটচা। এর এক সপ্তাহ পরে একটি দল নিয়ে আলিকদমে যান তিনি। সেখানে দুজন বয়স্ক রেংমিটচা-ভাষীর সন্ধান পান ডেভিড পিটারসন। ২০১০ সালে তিনি আবার যখন সেখানে যান, তখন খোঁজ পান আরও তিনজন ভাষীর।
২০১৩ সালে এসে এই ভাষা বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ভাষাবিজ্ঞানী পিটারসন। তবে বিষয়টি বাংলাদেশের গবেষকদের জানা ছিল না। বর্তমান নিবন্ধকারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে পিটারসন নিজেই জানিয়েছেন এই তথ্যগুলো। এখনো তিনি রেংমিটচা ভাষা নিয়েই কাজ করছেন।
২০১৪ সাল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার কাজ করতে গিয়ে রেংমিটচা-ভাষীদের সংস্পর্শে আসি আমরা। সে সময় আমি নিজে আমার গবেষণা-সহযোগীদের নিয়ে আলিকদম যাই। সেখানে সন্ধান পেলাম এক বয়স্ক রেংমিটচা-ভাষীর। তাঁর নাম রেংপুন ম্রো। তিনি ছাড়াও আলিকদমের পায়াপাড়াতে আমরা পেলাম আরও কয়েকজন ভাষীর সন্ধান। মজার বিষয় হলো, রেংমিটচারা নিজেদের পরিচয় দেয় ম্রো বলে। তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনও ম্রোদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ। সে কারণেও এই সম্প্রদায়কে পৃথক বা শনাক্ত করা কঠিন।

প্রশ্ন, প্রশ্ন এবং প্রশ্ন
কীভাবে নিশ্চিত হব রেংমিটচা একটি আলাদা ভাষা? এই প্রশ্নটি বারবারই এসেছে সামনে, বিশেষ করে রেংমিটচা ভাষার অস্তিত্ব জানার পর ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড পিটারসনসহ আমরা অনেকবারই মুখোমুখি হয়েছি এই প্রশ্নের। অনেকে এমনও বলেছেন, এটা যে ম্রো বা খুমি ভাষার উপভাষা নয়, সেটি কীভাবে নিশ্চিত হলাম আমরা?
একটি ভাষা একেবারে আলাদা কি না, তা নির্ণয়ে ভাষাবিজ্ঞানীরা পারস্পরিক বোধগম্যতার যে মানদণ্ড প্রয়োগ করে থাকেন, সেটি দিয়েই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ভাষাটি উপভাষা না সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভাষা। রেংমিটচা ভাষার ক্ষেত্রেও আমরা প্রয়োগ করেছি ওই বোধগম্যতার মানদণ্ড। এরপর যখন আমরা রেংমিটচা ভাষার সঙ্গে খুমি কিংবা ম্রো ভাষার তুলনা করেছি, তখন এই দুই ভাষাভাষীর পারস্পরিক বোধগম্যতা খুঁজে পাইনি।
লফলার প্রাথমিকভাবে রেংমিটচা ভাষাকে মিয়ানমারের ম্রো, খুমি (আওয়া খুমি) ভাষার একটি বৈচিত্র্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু পিটারসন তাঁর মিয়ানমারের একজন সহকর্মীর মাধ্যমে ম্রো, খুমি ভাষার সঙ্গে রেংমিটচা ভাষার পারস্পরিক বোধগম্যতার মানদণ্ড প্রয়োগ করলে দুটি ভাষা আলাদা বলে প্রমাণিত হয়েছে। পরে আমরা নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় পাওয়া এই তিন ভাষার উপাত্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে যে তুলনামূলক টেবিল তৈরি করি সেখানেও সাদৃশ্যের চেয়ে অমিলই পেয়েছি বেশি। এমনকি এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে রেকর্ডারও। রেকর্ডার ব্যবহার করে শোনানো হয়েছে ম্রো ও খুমিদের, যাতে তারা কতটুকু বোঝে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এভাবে ধাপে ধাপে প্রমাণিত হয়েছে যে রেংমিচটা একটি সম্পূর্ণ আলাদা ভাষা। তবে এ সিদ্ধান্তের সমাপ্তি টানতে আরও কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি।

বান্দরবানের আলিকদম এলাকায় বয়স্ক রেংমিটচা-ভাষী রেংপুন ম্রোরেংমিটচা ভাষা প্রসঙ্গে
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর মধ্যে বেশ কিছু ভাষা তিব্বতি-বর্মি ভাষা-পরিবারভুক্ত। তিব্বতি-বর্মি ভাষা-পরিবার একটি বৈচিত্র্যময় ভাষা-পরিবার। এ ভাষা-পরিবারের ভাষাগুলো উত্তর ভারত থেকে পূর্বের উত্তর-পশ্চিম ভিয়েতনাম পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে একই সঙ্গে তিব্বতি-বর্মি ভাষা-পরিবারের অনেক গোত্র থাকার কারণে এ অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ভাষিক বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি স্থান হিসেবে বিবেচ্য। রেংমিটচা ভাষাটিও তিব্বতি-বর্মি ভাষা-পরিবারের কুকি চিন উপভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি ভাষার লিখিত রূপ থাকা ওই ভাষাটির মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। পিটারসন রেংমিটচা ভাষার বর্ণমালা উদ্ভাবন সম্পর্কে বলেন, ক্রামালিপি ব্যবহারের মাধ্যমেও সহজে রেংমিটচা ভাষা লেখা সম্ভব। কেননা, ম্রো ভাষার ধ্বনিগুলোর সঙ্গে রেংমিটচা ভাষার ধ্বনিগুলোর মিল রয়েছে। তবে রেংমিটচা ভাষার জন্য ক্রামালিপি ছাড়াও রোমান বা বাংলালিপি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তাদের যেকোনো একটি লিপি গ্রহণ করতে হবে। যদি লিপি নির্ধারিত হয়, তবে আমরা এ ভাষার লিখিত সম্পদ সৃষ্টি এবং ভাষা সংরক্ষণের কাজ শুরু করতে পারব। এতে পরবর্তী প্রজন্ম চাইলে শিখতে পারবে এই ভাষা।

আমাদের করণীয়
রেংমিটচা একটি বিপন্ন ভাষা। বর্তমানে বাংলাদেশে এই ভাষার ৩০ থেকে ৪০ জন ভাষী বা অর্ধভাষী জীবিত আছে। ভাষাটি তাদের দুই-তিন প্রজন্ম শেখেইনি। যারা ভাষাটি জানে, তাদের অধিকাংশই বয়োবৃদ্ধ। তাদের বেশির ভাগ তাদের যৌবন-পরবর্তী সময়ে এ ভাষার পরিবর্তে ম্রো ভাষা ব্যবহার করেছে।
এটি আমাদের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক যে এখনো রেংমিটচা ভাষাভাষী রয়েছে এবং ভাষাটি এখনো জীবিত। পাশাপাশি আমাদের হাতে এ ভাষা থেকে উপাত্ত সংগ্রহের সুযোগও বিদ্যমান। আমাদের জন্য একটি আনন্দের সংবাদ হলো রেংমিটচা ভাষা বাংলাদেশ এবং সমগ্র পৃথিবীর জন্য এখনো ভাষিক-বৈচিত্র্য ধারণ করে আছে। আবার আমাদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে রেংমিটচা আমাদের জন্য একটি সতর্কসংকেত। তাই এ ভাষার বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এটি বলা অযথার্থ নয় যে এটি একটি মৃতপ্রায় ভাষা। আর এ ভাষা রক্ষার জন্য আমাদের হাতে খুবই সামান্য সুযোগ রয়েছে। যার মধ্যে ভাষাটি রেকর্ড করা গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। পাশাপাশি কীভাবে এই ভাষার ব্যাকরণ কাজ করে, জানা দরকার সেটিও। পরবর্তী ধাপে এই রেকর্ডিংয়ের অনুবাদ করে ভাষাটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলাদেশ ও দেশের বাইরের সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া বয়স্কভাষী যাঁরা এই ভাষাটি জানেন, ভাষাটিতে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ততা ফিরিয়ে আনার জন্য, এ ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রেও উৎসাহ দেওয়া দরকার। বর্তমান প্রজন্মের ভাষী যারা এ ভাষাটি শিখতে চায়, উৎসাহ দিতে হবে তাদেরও। বলা দরকার, ইতিমধ্যে রেংমিটচা ভাষার কিছু অডিও রের্কডিং করা হয়েছে। করা হয়েছে উপাত্ত সংগ্রহও, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়।
একটি বিপন্ন ভাষার ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য হলো, ভাষাটির ভাষী যদি ওই ভাষা ব্যবহার না করে, তবে সে ভাষার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আমরা কেউ রেংমিটচা ভাষার মৃত্যু চাই না। বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া এ বিপন্ন ভাষাটি রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন