শিল্প ও সাহিত্য     সংবাদ

জসীমউদ্দীনের অগ্রন্থিত কবিতা

সংগ্রহ ও ভূমিকা: আহমাদ মাযহার | ১০ মার্চ ২০১৭, ০২:১১  

একসময় তাঁকে ‘পল্লিকবি’ ঘেরাটোপে আবদ্ধ করা হলেও জসীমউদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে এখন বদলাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁকে নিয়ে বাড়ছে আগ্রহও। ১৪ মার্চ এই কবির মৃত্যুদিন। এই অবকাশে পড়া যাক তাঁর কয়েকটি অগ্রন্থিত কবিতা

জসীমউদ্‌দীন (১ জানুয়ারি ১৯০৩—১৪ মার্চ ১৯৭৬)। প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালজসীমউদ্দীনের কবিতায় বাংলাদেশের গ্রামীণ আবহ থাকে। কিন্তু কবিকল্পনায় পাঠকদের তিনি এমনই এক অন্তরঙ্গ আদিকল্পের জগতে অনায়াসে নিয়ে যেতে পারেন, যার সন্ধান আমাদের আধুনিকবাদী কবিরা সাধারণত দিতে পারেন না। বাংলার গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতিকে যে স্নিগ্ধতায় পাওয়া যায়, তা-ই যেন মূর্ত করে তোলেন তিনি। জীবন ও প্রকৃতির, কল্পনার ও বাস্তবের জড়াজড়ি করে থাকা এক স্নিগ্ধ জগৎকে জসীমউদ্দীন হাজির করেন কবিতায়। লোককথা-রূপকথার ভুবন থেকে, গ্রামীণ লোকজীবনের প্রাসঙ্গিকতা থেকে সংগ্রহ করেন শব্দ ও ছবি। লোকসংগীত থেকে তুলে নেন সুর।

আমাদের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে আধুনিকবাদিতা গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ষাট ও সত্তরের দশকে এমনই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে তখনকার সমালোচনা জসীমউদ্দীনকে যেন দেখছে আধুনিকতার বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর সৃষ্টিধারাটিকে যে উপেক্ষা করা হতো তা তিনি অনুভব করতেন গভীর বেদনার সঙ্গে। বাংলাদেশের তিরিশি আধুনিকবাদী কবিদের বলতেন পাশ্চাত্যানুসারী। বাংলাদেশের কবিতার সত্যিকারের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন নিজেকে। পল্লিকবি হিসেবে নিজের পরিচয় দিতেন বলেও তাঁকে আধুনিকতা প্রপঞ্চের বাইরে রাখা হতো। কিন্তু প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন আধুনিক একজন কবি। লোককবিদের জীবনানুভূতিকে যে তিনি নাগরিক পরিশীলিত মানুষের আস্বাদ্য করে তুলে ধরছিলেন তাতেই তাঁর আধুনিকতার মর্ম নিহিত।
জসীমউদ্দীনের কবিতায় নগরবাসীর প্রতি আহ্বান আছে গ্রামজীবনের মহিমাকে উপলব্ধি করার! অন্য আধুনিক কবিদের সঙ্গে এইখানে তাঁর পার্থক্য। অনেকে তাঁর কবিতার সঙ্গে লোককবিদের পৃথকতা খুঁজে পান না। তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না যে জসীমউদ্দীনের কবিতা নগরমানসেরই কবিতা, যা গ্রামীণ রূপকল্পের ওপর ভিত্তি করে রচিত। পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সঙ্গে বাংলার আধুনিকতার পার্থক্যই সূচিত হওয়ার কথা এই গ্রামীণ জীবনদৃষ্টির সংশ্লেষণের ফলে। কিন্তু বিগত শতকের তিরিশি আধুনিকতা তার চেতনা সংগ্রহ করেছিল পাশ্চাত্যের নাগরিক মানস থেকে, যা বাংলাদেশে তখনো বাস্তব হয়ে ওঠেনি। ফলে সীমিতসংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন তাঁরা। অপরদিকে দেখা গেছে, গ্রামীণ উৎস থেকে আসা শিক্ষিত অধিকাংশ বাঙালি পাঠকের কাছে জসীমউদ্দীন পেয়েছিলেন সত্যিকারের সমাদর।
বাৎসল্য রসের কবিতা রচনা জসীমউদ্দীনের কবিতাচর্চার একটি বিশিষ্ট দিক। তাঁর কবিতার এই দিকটি নিয়েও বেশি আলোচনা হয়নি। তাঁর সামগ্রিক কবিসত্তার ভেতর থেকে এই কবিতাগুলোর বিশিষ্টতা নজরে আসে। সেই রকমই কয়েকটি কবিতা এখানে উপস্থাপন করা হলো।
এখানে প্রদত্ত ‘একরত্তি খুকু’ কবিতাটি ছাপা হয়েছিল বার্ষিকশিশুসাথীতে, ১৩৬০ সালে। এর আংশিক উল্লেখ পেয়েছিলাম কয়েক বছর আগে প্রয়াত শিশুসাহিত্যিক ও শিশুসাহিত্যের সমালোচক-গবেষক আতোয়ার রহমানের এক রচনায়। সেখানে এই কবিতার কয়েকটি মাত্র চরণ উল্লিখিত হয়েছিল। আমরা এখানে পুরোটা উদ্ধার করতে পারলাম। সম্প্রতি আবদুল মান্নান সৈয়দের জসীমউদ্দীন-চর্চা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেছি জসীমউদ্দীনের বিপুলসংখ্যক রচনা এখনো অগ্রন্থিত রয়ে গেছে।
আমাদের বন্ধু ছড়াকার-শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সংগ্রহে শিশুসাহিত্যবিষয়ক প্রচুর পুরোনো প্রকাশনা জমে উঠেছে। সম্ভবত দুই বাংলা মিলিয়েই তাঁর ব্যক্তিগত ছোটদের বইয়ের সংগ্রহ উল্লেখযোগ্য। ২০১০ সালে তাঁর বাড়িতে শিশুসাথীর দুর্লভ সংকলনটি পেয়ে ‘একরত্তি খুকু’ কবিতাটি কপি করে নিয়েছিলাম। বন্ধুতার সূত্রে মাঝেমধ্যেই তাঁর সংগ্রহ ঘাঁটবার সুযোগ নিই। এমনি সুযোগে বার্ষিক শিশুসাথীর ১৩৬৮-এর প্রকাশনায় পেয়ে যাই ‘মেয়ে’ কবিতাটি। আর আমীরুলের সংগ্রহ থেকেই ফওজিয়া সামাদ সম্পাদিত মিনার পত্রিকার নির্বাচিত রচনা সংগ্রহ-তে পেয়ে যাই ‘বন্দী’ এবং আল কামাল আবদুল ওহাব সম্পাদিত সংকলন মধুমালতীতে পাই ‘চাঁদের মেলা’ কবিতাটি। কবির জীবৎকালে অগ্রন্থিত কয়েকটি কবিতা নিয়ে যমুনাবতী নামে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান সংগ্রহের কবিতাগুলো সেখানে অন্তর্ভুক্ত নেই। এখানে সংকলিত চারটির কোনোটিই আমার জানামতে জসীমউদ্দীনের আর কোনো রচনা সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। উপরন্তু কবিতাগুলোতে এখনকার প্রমিত বানানরীতি ব্যবহার করা হয়েছে।
কী অসাধারণ ব্যঞ্জনা ‘একরত্তি খুকু’ কবিতাটির! প্রতিটি চরণে কল্পনাশক্তির কী প্রতাপ! বাৎসল্য রসের এমন চুইয়ে-চুইয়ে পড়া বাংলা ভাষার খুব কম কবিতাতেই পাই আমরা। শোলক-বলা সুরের সজীবতা কী প্রসন্নই না করে আমাদের মন। ‘মেয়ে’ কবিতাটিতেও ছোট মেয়েকে নিয়ে কী অসাধারণ বাৎসল্য রসের প্রকাশ ঘটেছে। তেমনিভাবে অন্য কবিতায়ও ছেলেবেলার রঙিন কল্পনা অসাধারণ ব্যঞ্জনায় রঞ্জিত। কেবল তা-ই নয়, নিজের সামগ্রিক কাব্যভুবনে তাঁর স্বাতন্ত্র্যের মুদ্রাচিহ্ন যেমন পাঠকমাত্রেরই মনে সাড়া দেয়, তেমনি বাৎসল্য রসের এই কবিতাগুলোতেও আমরা পাই স্বতন্ত্র এক মৌলিক কবিকে।

মেয়ে
আমাদের বাড়ি না আসিয়া তুই ভালো করেছিস মেয়ে,
আমরা কি আর এমন করিয়া সাজাতাম তোরে পেয়ে!
এ বাড়িতে তুই সন্ধ্যা-প্রদীপ শান্ত গৃহের কোণে,
এ বাড়ির তুই শুভশঙ্খ যে বাজিস সকল ক্ষণে।
এ বাড়ির তুই মঙ্গলঘট বহিয়া শীতল বারি,
যে আসে নিকটে স্নেহ-মমতায় আপন হস যে তারি।
এ বাড়ির তুই সন্ধ্যা-মালতী আঙিনার কোণে ফুটে,
বিছায়ে দিছিস সন্ধ্যার মেঘ আকাশ হইতে লুটে।

আমাদের বাড়ি ছিলি বুলবুলি এ বাড়িতে হলি গান,
আমাদের বনে ছিলি তুই বেণু এ বাড়ি বাঁশির তান।
আমাদের ঘরে ছিলি তুই ধারা এ বাড়িতে হলি নদী,
তটের রেখার গহনা পরিয়া চলেছিস নিরবধি।
ঘুমায়ে আছিলি রঙিন ঝিনুক সাগরদীঘির তলে
মাণিক হইয়া হাসিস আজিকে স্বতী তারকার জলে।
এ বাড়ির তুই আঙিনার কোণে সোনার দেউটি হয়ে
নিজেই দেবতা হয়ে রয়েছিস এ বাড়ির দেবালয়ে।

বার্ষিক শিশু-সাথী, ১৩৬৮

.একরত্তি খুকু
একরত্তি আদর আমার, একরত্তি হাসি,
একরত্তি চাঁদ নিঙাড়ি জোছনা-ধারায় ভাসি।
একরত্তি ঝিনুক-পোরা সাত-সাগরের মণি,
একরত্তি হীরক পেনু ঢুড়ি হাজার খনি।

একরত্তি সোহাগ-ভরা একরত্তি খুকু,
একরত্তি রামধনুকে আকাশ ডুগুডুগু।
এরে আমি কোথায় রাখি, একরত্তি জল,
দুর্ব্বাশীষে সোয়ার হয়ে জগৎ ঝলমল!

একরত্তি পাখীর ঠোঁটে একরত্তি গান,
বনে বনে কুসুম হাসে, আনে রঙের বান।
একরত্তি শঙ্খভরা সমুদ্দুরের গীতি,
একরত্তি খুকু আমার লক্ষ মনের প্রীতি।

এরে আমি কোথায় রাখি, ছড়ার গড়াগড়ি,
গড়গড়িয়ে দেব নাকি আকাশটা ভরি?
চাঁদে যেয়ে চাঁদ হবে সে, তারায় হবে তারা,
বাতাসেতে ফুল হয়ে সে করবে সুবাস পাড়া।
প্রজাপতির পাখায় চড়ে ফিরবে ঘুরে ঘুরে,
তারে আমি ধরে রাখব শোলক-বলা সুরে।

বার্ষিক শিশু-সাথী, ১৩৬০

বন্দী
খাঁচায় তোমায় বন্দী করে
কে রেখেছে খুকুন পাখি
দূর আকাশের বিজলী লতা
আঁচল দিয়ে বাঁধবে নাকি?
কহন কথা দেখন কথা
হসন কথা দশন দুলি,
বন্দী খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে
লীলার কথার এ গুলগুলি
সাধ্য কাহার বাঁধতে পারে
এক্ষুণি মা আসবে ছুটি,
রামধনুকের সাতনড়ি হার
চুমোয় চুমোয় পড়বে লুটি।

মিনার (১৩৫৬?)

.চাঁদের মেলা
এতটুকু ছোট খুকু, আকাশটারে ধরে
দিতে গেলুম, খুকু তাহা রাখবে কেমন করে।
এপাশ দিয়ে ওপাশ দিয়ে সবখানে সে রয়,
এতটুকুন হাতে সে তা কেমন করে লয়!
দিতে গেলুম চাঁদের হাসি, ছোট্ট তাহার মুখ
আকাশ ভরা জোছ্না, তাতে ধরবে কতটুক!

দিতে গেলুম পুকুরটিরে, চোখ দুইটি ভরে,
এতবড় পুকুর সেথা ধরবে কেমন করে!
দিতে গেলুম কহন-কথা আঁচলখানি ভরে,
এতটুকু আঁচল বেয়ে গড়গড়িয়ে পড়ে!

মধু-মালতী, আষাঢ় ১৩৭১

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন