শিল্প ও সাহিত্য     সংবাদ

বইপত্র

সমাজের এক টুকরো ছবি

আখতার হুসেন | ১০ মার্চ ২০১৭, ০২:১২  

.সুস্মিতার বাড়ি ফেরার কাহিনি পাঠককে শুরুতেই এমন এক দোলাচলের সঙ্গী করবে, করে তুলবে এমন জাগর প্রহরীর মতো, শুরু হওয়া ঘটনার শেষ কোথায়, এটি দেখেই তবে তাঁরা বইয়ের মলাট বন্ধ করবেন। অর্থাৎ এমন এক নাটকীয়তা দিয়ে এ উপন্যাসের কাহিনির সূচনা, হৃদয়কে যা সত্যিই মুহূর্তে আলোড়িত করে।
সুস্মিতার এনগেজমেন্ট হয়েছে রাজীব নামের এক যুবকের সঙ্গে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর মাঝামাঝি সময়ে একদিন রাজীব সুস্মিতাকে তার সঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এ ব্যাপারে রাজীবেরই উদ্যম ও আগ্রহ প্রবল। সরাসরি হবু শাশুড়ি অর্থাৎ সুস্মিতার মায়ের কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে নেয় সে। ফলে সুস্মিতার মনে হবু বরের সঙ্গে বিয়ের আগে বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, মুহূর্তে তা উবে যায়। বেড়াতে বের হয়ে যায় সে রাজীবের সঙ্গে।

এই যে সুস্মিতার রাজীবের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাওয়া, তার ফলাফল টের পাওয়া যায় উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেই। এ অধ্যায়ের শুরুতেই রাজীব দাঁড়িয়ে আছে সুস্মিতার মায়ের সামনে। এবং বলছে, ‘মুখের কথায় কিছু বলছি না। এই যে দেখুন মোবাইল।...এটাই শেষ ছবি নয়। এ রকম আরও অসংখ্য ছবি আছে। আমার হাতে তুলে দিয়েছে তার (সুস্মিতার) সাবেক প্রেমিক। বিষয়টা এমনি এমনি ছেড়ে দিতে পারি না আমি। এনগেজমেন্টের পেছনে আমার বহু টাকা খরচ হয়েছে। তার সঙ্গে প্রায় দশ লাখ টাকার সম্মান যোগ হয়েছে। এক কোটি টাকার কষ্ট পেয়েছি আপনার গুণবতী মেয়ের কল্যাণে। তার সঙ্গে এনগেজমেন্টের কারণে আমার পরিবারে আমি মুখ দেখাতে পারছি না।’

সুস্মিতার বাড়ি ফেরা—মোহিত কামাল প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল, প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০১৭, ১১২ পৃষ্ঠা, দাম: ২৫০ টাকা।

লেখক মোহিত কামালের ভাষায়, ‘নিজের মেয়ের বিকৃত ও অশ্লীল ছবি দেখে কেবল স্তব্ধ হয়ে যাওয়াই নয়, পুরোপুরি বোধশূন্য হয়ে গেলেন সুস্মিতার মা।’ এসব ‘প্রমাণচিহ্ন’ বোধের গভীরে শুধু আলোড়নই তুলল না, সামনে দাঁড়ানো এই যুবককেও তিনি এখন আর চিনতে পারছেন না।’ না চিনতে পারারই কথা। কেননা, তিনি তাঁর মেয়েকে ভালো করেই জানেন।
আসলে সুদর্শন রাজীব সাইবার ক্রাইম চক্রের সঙ্গে জড়িত। বেছে বেছে মেয়েদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। ছবি তোলে। তারপর সেই সব ছবি সুপার ইম্পোজ বা সম্পাদনা করে তার সঙ্গে নগ্ন ছবি জোড়া দিয়ে ফাঁদ-পাতা মেয়ে ও তাদের পরিবারকে ব্ল্যাকমেল করে টাকা কামায়। সুস্মিতার বেলায়ও তা-ই করা হয়। তারও নগ্ন ছবি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার মুখে সুস্মিতাদের পরিবারে সাময়িক ঝড় ও অশান্তির ঢেউ উঠলেও, লোকমুখে কটুকাটব্য শুনলেও—একেবারে ভেঙে পড়ে না তারা। এই ঘটনা শুরু হওয়ার পর থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত সুস্মিতার বান্ধবী ঝুমকি, ছোট ভাই সোহান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সায়ন্তনী ম্যাম ও তার বাবার বন্ধু হায়দার সাহেব যে ভূমিকা রাখেন, তা ভোলার নয়। সত্যিকারের প্রতিবাদী এসব চরিত্র এবং র্যা বের সাইবার ক্রাইম উইংয়ের কারণে অবশেষে ধরা পড়ে প্রধান অপরাধী রাজীব। অপরাধী চক্রের অন্য সদস্যদের ধরা পড়ার সম্ভাবনার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়। তবে সুস্মিতাদের পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সাইবার ক্রাইম চক্রের হাতে জীবন দিতে হয় দুজনকে—হায়দার ও সুস্মিতার ছোট ভাই সোহান।
আলোচ্য উপন্যাসে সমাজে চলমান ঘটনাকে মোহিত কামাল কথাসাহিত্যের যে বিন্যাস ও কারুতায় তুলে ধরেছেন, তা নিঃসন্দেহে অনন্য। কোথাও বাহুল্য নেই, নির্মেদ এই উপন্যাসের কাহিনি সমাজ-ভাবনার সঙ্গী প্রতিটি পাঠককে আলোড়িত করবে।

 

পাঠকের মন্তব্য (১)

  • Rokib Likhon

    Rokib Likhon

    পড়ার জন্য আগ্রহ জাগল।।
     
মন্তব্য করতে লগইন করুন